অন্বেষণ ডেস্ক : মানিকগঞ্জে মাছ চুরির অভিযোগে কৃষ্ণ রাজবংশী (৩৫) নামের এক যুবককে মারধরের পর তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (৬ মে) সন্ধ্যায় সদর উপজেলার একটি বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয় থেকে এই লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত কৃষ্ণ রাজবংশীর বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বান্দুটিয়া মাঝিপাড়া এলাকায়। এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় এবং সদর থানা পুলিশের সূত্রমতে, বুধবার সকালে সদর উপজেলার তরা মাছের আড়ত থেকে মাছ চুরির অভিযোগ ওঠে। এই সন্দেহে কৃষ্ণ রাজবংশীসহ দুজনকে প্রথমে আটক করে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির লোকজন।
পরবর্তীতে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. ইব্রাহিমের জিম্মায় আটকদের একজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু অপর যুবক কৃষ্ণ রাজবংশীকে কমিটির কার্যালয়ে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আটকে রাখার পর সেখানে ওই যুবকের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর সকাল থেকে দুপুরের মধ্যবর্তী কোনো একসময়ে তিনি ফ্যানের সঙ্গে গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে প্রচার করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দুপুরে কমিটির লোকজন কার্যালয়ের তালা খুলে ভেতরে যান। তখন তারা যুবকটিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান এবং দ্রুত বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
হাসপাতালে চিকিৎসার কথা বলে তারা তড়িঘড়ি করে লাশটি সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তবে উপস্থিত স্থানীয় জনতা তাদের এই কার্যকলাপে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং তাতে কঠোরভাবে বাধা দেয়।
উত্তেজিত জনতার বাধার মুখে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
বিকেলে সদর থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল থেকে ওই যুবকের লাশ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার করে। এই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশ ইতোমধ্যে জোরালো কাজ শুরু করেছে।
সার্বিক বিষয়ে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. ইব্রাহিমের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে বুধবার রাত পর্যন্ত একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি কোনো ফোন রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, কমিটির সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন পুরো ঘটনার বিষয়ে আংশিক মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, চুরির অভিযোগে দুজনকে আটকের কথা তিনি লোকমুখে শুনেছিলেন।
তার দাবি, অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও কৃষ্ণের কোনো অভিভাবক আসেননি। তাই বাধ্য হয়ে তাকে সেখানে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরে সে নিজেই আত্মহত্যা করেছে বলে তিনি শুনেছেন।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকরাম হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, লাশ উদ্ধারের পর তা ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও স্পষ্ট করে বলেন, চোর সন্দেহে কাউকে আটকে রাখলে তা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো বাজার কমিটির দায়িত্ব। কিন্তু তারা সেটি না করে আইন সম্পূর্ণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে।
পুলিশ বর্তমানে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে তরা মাছের আড়ত এলাকায় এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।


