‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অমিয় বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে নতুন বছর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত উত্তরের জনপদ বগুড়া। আর মাত্র একদিন পরেই বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এই উৎসবকে ঘিরে বগুড়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গন, কুমার পল্লী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন উৎসবের কর্মযজ্ঞ তুঙ্গে।
বগুড়া আর্ট কলেজে গিয়ে দেখা যায় এক মহাব্যস্ততার চিত্র। দিন-রাত চলছে তুলির আঁচড় আর রঙের খেলা। শিক্ষার্থীরা কেউ লোকজ মুখোশ বানাচ্ছেন, কেউ শখের হাঁড়ি বা সরাচিত্রে অলঙ্করণ করছেন। বাঁশ ও শীতল পাটি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিশালাকৃতির ইলিশ এবং বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক ঘোড়া। কলেজের গ্রাফিক ডিজাইনের প্রভাষক মো. রবিউল ইসলাম জানান, অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতেই তারা কাজ করছেন। শুধু আর্ট কলেজই নয়, বেসরকারি আর্টস একাডেমিগুলোও বর্ণিল প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রয়েছে।
বর্ষবরণ মেলাকে কেন্দ্র করে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া ও শাহজাহানপুর উপজেলার মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। শিশুদের জন্য রকমারি পুতুল, ফুলদানি, হাঁড়ি-পাতিল, হাতি, ঘোড়া ও মাটির ব্যাংক তৈরিতে ব্যস্ত নারী-পুরুষ ও শিশুরা। অন্যদিকে, গ্রাম-বাংলার বাদ্যযন্ত্র ঢোল-ঢাক, দোতারা ও একতারার শিল্পীরা ব্যস্ত রয়েছেন তাদের বাদ্যযন্ত্র ঠিকঠাক করে নিতে।
পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বগুড়া সাংস্কৃতিক ফোরামসহ বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয়গুলোতে নাচ, গান ও নাটকের মহড়া চলছে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমি যৌথভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। শহরের পৌর পার্কের শহীদ টিটু মিলনায়তন চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী ৪৫তম বৈশাখী মেলা। ১৪ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচদিন ব্যাপী এই মেলায় লাঠিখেলা, সাপখেলা ও বায়োস্কোপসহ বিলুপ্তপ্রায় লোকজ সংস্কৃতির প্রদর্শনী থাকবে।
চিত্রশিল্পী চন্দন কুমার ও শিক্ষক এনামুল হক মাসুদ বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির পরিচয়ের অংশ। এই উৎসবের মাধ্যমেই নতুন প্রজন্ম খাঁটি বাঙালিয়ানার স্বাদ পাবে। নৃত্যাঞ্জলী আর্টস একাডেমির পরিচালক কেএম কামরুল হাসান পাশা ঐতিহ্য রক্ষায় সবার আন্তরিকতার ওপর জোর দিয়েছেন।
বগুড়া জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, “পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতির শেকড়। এই শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত উপাদান ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”
পান্তা-ইলিশ, পিঠা-পুলি আর জারি-সারি ও বাউল গানের সুরে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এখন প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে জেলাবাসী। শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্রই এখন বইছে উৎসবের আগাম আনন্দ।


