উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত বগুড়া জেলা। এই জেলার দই যেমন সারাদেশসহ বিদেশেও সমাদৃত হওয়ায় এটি জিআইপণ্য হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। দইয়ের পাশাপাশি লাচ্ছা সেমাইও এ জেলায় বিখ্যাতের খেতাব অর্জন করেছে। তবে লাচ্ছা সেমাইয়ের গোঁড়ার কথা যদি বলি, এর মূল উৎপত্তিস্থল পাকিস্তানে। দেশ স্বাধীনের আগে বিহারীদের হাতে ধরে এদেশে লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রচলন হয়।
বগুড়ার অধিকাংশ কারিগররা তাদের কাছে থেকেই লাচ্ছা সেমাই তৈরি শিখেছেন। পঞ্চাশের দশকে সৈয়দপুরে লাচ্ছা সেমাই প্রচুর তৈরি হতো। সেখানকার কারিগরদের হাতে ধরে শিখে বগুড়ায় চালু করা হয়। এরপর কালক্রমে বগুড়াই হয়ে উঠে উত্তরবঙ্গের লাচ্ছা সেমাই তৈরি ও বিক্রির ঘাঁটি। সবচেয়ে বেশি সেমাই কারখানা রয়েছে বগুড়া শহরের মাদলা, বেজোড়া, ঢাকন্তা, শ্যাওলাকান্দি, বনানী, সুলতানগঞ্জপাড়া, চেলোপাড়া, নারুলী ও বৃন্দাবনপাড়ায়। চাহিদার কারণে এখন সাদা সেমাই তৈরি হচ্ছে শেরপুর, ধুনট, শাজাহানপুর, কাহালু, নন্দীগ্রাম, শিবগঞ্জ, দুপচাঁচিয়া ও গাবতলী উপজেলায়। সবমিলিয়ে জেলায় প্রায় চার শতাধিক সেমাই কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে সাদা সেমাই।
পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে এখানে শত শত কোটি টাকার সেমাই উৎপাদিত হয়। বিসিক শিল্প নগরী থেকে শুরু করে শহরের অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মৌসুমি কারখানা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, অধিক লাভের আশায় এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পুঁজি করে অনেক কারখানায় চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদন করা হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পরিচ্ছন্নতার বালাইহীন এসব কারখানায় উৎপাদিত সেমাই কেবল খাদ্য নয়, বরং বিষ হিসেবে মানুষের পাতে পৌঁছাচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ ছোট ও মাঝারি মানের কারখানায় নুন্যতম কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। কারখানার ভেতরকার চিত্রগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ: অধিকাংশ কারখানাগুলোতে অপরিচ্ছন্ন অস্বাস্থ্যকর স্যাঁতস্যাঁতে ও নোংরা মেঝেতে আটা বা ময়দার খামির তৈরি করা হয়। নোংরা পরিবেশে মিছরি তৈরি ও সংরক্ষণ, কালিযুক্ত পেপারে সেমাই সংরক্ষণ, পঁচা ময়লা ও আবর্জনার স্তুপের পাশেই প্রস্তুত, সেমাই সংরক্ষণের খাচা নোংরা এবং জীবাণুযুক্ত পরিবেশে রাখা।
কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের হাতে কোনো গ্লাভস বা মাথায় ক্যাপ থাকে না। প্রচন্ড গরমে শ্রমিকদের শরীর থেকে ঘাম ঝরছে এবং সেই ঘাম সরাসরি মিশে যাচ্ছে সেমাইয়ের খামিরের সঙ্গে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের খামিরের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করতেও দেখা গেছে। অন্যদিকে লাচ্ছা সেমাইয়ের অন্যতম উপকরণ হলো ডালডা বা ঘি। কিন্তু খরচ কমাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি নিম্নমানের পাম অয়েল বা নিম্নমানের ডালডা ব্যবহার করছে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, একই তেল বারবার পুড়িয়ে লাল করে ফেলা হচ্ছে এবং সেই ‘পোড়া তেলে’ই ভাজা হচ্ছে সেমাই। কিছু কিছু জায়গায় শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত চর্বি মেশানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। নিষিদ্ধ কেমিক্যাল ও কৃত্রিম রং: সাধারণ সেমাইকে সাদা বা সোনালি রঙের রূপ দিতে অনেক কারখানায় টেক্সটাইল ডাই বা কাপড়ের রঙ ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া সেমাই দীর্ঘস্থায়ী ও মচমচে করতে স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হচ্ছে।
লাচ্ছা সেমাই তৈরি করার পর প্যাকিং ও স্টোরেজ পদ্ধতিতে সেগুলো রাখার জন্য খোলা জায়গায় স্তুপ করে রাখা হয়। সেখানে মাছি, ধুলোবালি এমনকি ইঁদুর টিকটিকি তেলাপোকারও অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে। প্যাকিং ও স্টোরেজ পদ্ধতি যেটাই হোক সেগুলো বিপণণ করতে এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা আকর্ষণীয় ও চাকচিক্যময় প্যাকেটে ভরে ফেলে। এমনকি বড় বড় ব্র্যান্ডের নাম নকল করে বাজারজাত করতে এদের দৌড়ের অন্ত নেই।
প্রতি বছর বগুড়ায় রমজানের শুরু থেকে পবিত্র ঈদুল ফিতর উৎসব কেন্দ্র করে কারখানার মালিকেরা তাদের তৈরী এসব প্রসিদ্ধ পণ্য কে কার আগে বাজার ধরতে পারে সে প্রতিযোগিতার কমতি নেই। এসব কারখানায় প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টন লাচ্ছা সেমাই তৈরী হবে। এবার ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় থেকে ২’শ কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে লাচ্ছা সেমাই। এসব কারখানায় প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কর্মরত। ঈদ উপলক্ষে এসব কারখানায় নরমাল,ডালডা ও ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই উৎপাদন হচ্ছে। এবার এই সেমাইয়ে বিক্রি ৪৮০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। যা গত বছরের তুলনায় অন্তত ৫০ কোটি টাকা বেশি।
বগুড়ার তৈরি এসব লাচ্চা সেমাই যায় রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, চট্রগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায়। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন কোম্পানি বগুড়া থেকে লাচ্ছা সেমাই তৈরি করে নিয়ে নিজেদের প্যাকেটে ভরে সারাদেশে নিজ কোম্পানীর নামে বিক্রি করে। সেমাই তৈরির জন্য জেলার আশপাশে বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে উঠেছে সেমাই পল্লী। আধুনিক মেশিনে মানসম্মত উপায়ে তৈরি হচ্ছে এসব লাচ্ছা সেমাই। তবে কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী শ্রমিক দিয়ে ম্যানুয়ালি লাচ্ছা সেমাই তৈরি করছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মত বিশ্লেষনে: কারখানাগুলো নিম্নমানের লাচ্ছা সেমাইয়ে বারবার একই তেল পোড়ানো,নিম্নমানের ডালডা ও পাম অয়েল ব্যবহার করায় মানবদেহে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ও বিষাক্ত রাসায়নিকের সমন্বয়ে তৈরি এই সেমাই মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদী এবং প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সেমাই নিয়মিত খেলে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে: লিভার ও কিডনি জটিলতা: কাপড়ের রং এবং নিম্নমানের পোড়া তেল সরাসরি লিভারের কর্মক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘদিন এই খাবার গ্রহণ করলে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। হতে পারে পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যান্সার, নিম্নমানের ডালডা এবং পাম অয়েল রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা থেকে হৃদরোগ বা স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। আর বিশেষ করে এসব নিম্নমানের খাবাব প্রস্তুতকরণে যত্রতত্র মাছি ও ধুলোবালির উপস্থিতিতে টাইফয়েড, জন্ডিস, ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তারা দ্রুত আক্রান্ত হয়।
বগুড়া নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ভূমিকা: অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদন ও বিক্রির বিরুদ্ধে বগুড়ায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে: ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় বিভিন্ন মৌসুমি কারখানায় নিয়মিত ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত এক মাসে বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ডজন কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এরমধ্যে ১০ মার্চ কাহালু উপজেলা এলাকার শেখাহার গ্রামের “মীম লাচ্ছা সেমাই” কারখানায় অভিযান। ৩ মার্চ শহরতলীর নিশিন্দারা এলাকার আলিফ লাচ্ছা সেমাই এর কারখানা এবং একই এলাকার শাহ লাচ্ছা সেমাই কারখানা ও মেসার্স মজিদ ফুড প্রোডাক্টস এ অভিযান ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। ২ মার্চ বগুড়া সদরের ইছাদহ এলাকার মেসার্স ফাতেমা সেমাই কারখানায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে ৩০ হাজার টাকা। ১ মার্চ শেরপুরের গোলাপপুর নাহিদ এন্ড নাদিম ফুড প্রোডাক্টস লাচ্ছা সেমাই কারখানায় অভিযান চালিয়ে এক লাখ টাকা। ২৮ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার ফুলবাড়ি মধ্য পাড়ায় অবস্থিত ‘সারাবেলা লাচ্ছা সেমাই’ কারখানায় যৌথ অভিযানে ২০ হাজার টাকা।
২৭ ফেব্রুয়ারি সাজাহানপুরের মাদলা পূর্বপাড়ার নিউ মাইশা স্পেশাল সেমাই কারখানায় পায়ে মাড়িয়ে ময়দার ডো তৈরী, অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে খাদ্য তৈরি করায় ৬০ হাজার টাকা জরিমানা। ২৬ ফেব্রুয়ারি কাহালুতে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরির দায়ে ‘ভাই ভাই লাচ্ছা সেমাই’ নামের একটি কারখানাকে ৩ লাখ টাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারি বগুড়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদন, পোড়া তেল ব্যবহার এবং অনুমোদনহীন রাসায়নিক রং প্রয়োগের দায়ে দুইটি লাচ্ছা সেমাই কারখানাকে মোট ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায়সহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার বেশ কয়েকটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে নানা দণ্ডে শাস্তি দেয়।
জেলা প্রশাসন, বগুড়া, র্যাব-১২ এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বগুড়া জেলা কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ক্যাবসহ পুলিশ সদস্যরা এসব অভিযানে অংশ গ্রহন করে।
অভিযানে উদ্ধারকৃত কয়েক হাজার মণ ভেজাল লাচ্ছা সেমাই এবং নিষিদ্ধ রাসায়নিক ড্রেনে ফেলে বা পুড়িয়ে ধ্বংসও করা হয়। কারখানায় সিলগালা, লাইসেন্স বাতিল করা হয় অনেক ক্ষেত্রেই। তবুও অধিকাংশ কারখানায় ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য তৈরি লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছেনা।
সচেতনা: সেমাই কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ। ভেজাল পণ্য তৈরী বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ব্যবসায়ীদের নিয়ে মতবিনিময়সভা করে তাদের স্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে খাদ্য উৎপাদন, বাজারে মনিটরিং টিমের কোনো অসাধু ব্যবসায়ী নামী ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে নকল পণ্য বিক্রি করতে না পারে সেটি নজরদারীও নিশ্চিত করা। বিএসটিআই-এর অনুমোদন ছাড়া কোনো কারখানাকে সেমাই উৎপাদনের অনুমতি না দেয়া।
অতি মুনাফার লোভ ভেজাল পণ্য তৈরী করার শাস্তি হিসেবে জেল ও জরিমানার বিধান। অন্যদিকে শুধু কারখানার মালিক বা তৈরিকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের অধিক মুনাফার লোভ ও উদাসীনতায় দায়ী নয়, ক্রেতা সাধারণদের সচেতন হতে হবে। পণ্য ক্রয়ের সময় প্যাকেটজাত সেমাইয়ের ক্ষেত্রে মেয়াদের তারিখ ও বিএসটিআই-এর সিল দেখে নেয়া উচিত।
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উৎসবে যেহেতু বগুড়ার লাচ্ছা সেমাই আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। এই ঐতিহ্যকে হাতে গোনা কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ উভয়কেই সোচ্চার হওয়া উচিত। উৎসবের আনন্দ যেন অসুস্থতার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।


