অন্বেষণ ডেস্ক : রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বাস দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে এক নবদম্পতির প্রাণ, বিয়ের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় যাদের এমন অকাল মৃত্যুতে এলাকায় ব্যাপক শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বুধবার বিকেলে দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে পল্টুন থেকে যাত্রীবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গেলে কাজী সাঈফ আহমেদ সৌম্য (৩০) ও ডা. ফাতেমাতুজ জহুরা অন্তী (২৭) নামের ওই দম্পতির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ দুপুর আড়াইটার দিকে রাজবাড়ীর শহীদ খুশি রেলওয়ে মাঠে নিহত স্বামী-স্ত্রীর জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় বহু মানুষ অংশগ্রহণ করে তাদের শেষ বিদায় জানান। এরপর রাজবাড়ী পৌরসভার নতুন বাজার কবরস্থানে অত্যন্ত বেদনাবিধুর পরিবেশে তাদের পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।
নিহত সাঈফ আহমেদ সৌম্য রাজবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা এলাকার কাজী মুকুলের ছেলে। তিনি কর্মজীবনে ঢাকার গুলশানে একটি সুপরিচিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। অন্যদিকে, তার স্ত্রী ফাতেমাতুজ জহুরা অন্তী একই এলাকার মৃত ডা. আব্দুল আলীমের মেয়ে। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর পারিবারিকভাবে এই জুটির বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর থেকে কর্মস্থলের সুবিধার্থে তারা ঢাকার উত্তরায় বসবাস করছিলেন। সম্প্রতি ঈদের ছুটিতে তারা গ্রামের বাড়িতে আসেন এবং ২৯ মার্চ পর্যন্ত তাদের সেখানেই থাকার কথা ছিল। তবে ঢাকায় এক সহকর্মীর বিয়েতে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা আগেভাগেই ফিরছিলেন।
ঢাকা ফেরার পথে বুধবার বিকেলে বড়পুল এলাকা থেকে তারা সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। যাত্রাপথে বাসটি দৌলতদিয়া ঘাটে এসে ফেরিতে ওঠার জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত হঠাৎ করেই বাসটি চালকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। চোখের পলকে এটি পল্টুন থেকে সোজা গভীর নদীতে পড়ে যায়। ফলে বাসের ভেতরে থাকা এই নবদম্পতিসহ অসংখ্য যাত্রী আটকা পড়েন।
দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া মাত্রই স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করে। দীর্ঘ প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলা শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের পর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ বাসটিকে পানির নিচ থেকে ওপরে তুলতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সদস্যরা বাসের ভেতর থেকে সৌম্য ও অন্তীর নিথর মরদেহ উদ্ধার করেন।
ভাতিজা ও পুত্রবধূর এমন অকাল মৃত্যুতে নিহত সৌম্যের বড় চাচা কাজী গোলাম আহমেদ গভীরভাবে শোকাহত। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি জানান, নিজের সন্তানের মতোই তিনি তার ভাইয়ের একমাত্র ছেলে ও পুত্রবধূকে বড় করেছেন। তাদের এমন আকস্মিক মৃত্যু মেনে নেওয়া পরিবারের সদস্যদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। তিনি সকলের কাছে নিহত নবদম্পতির রুহের মাগফিরাতের জন্য বিনীতভাবে দোয়া কামনা করেছেন।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বাসটির চালক আরমানসহ সর্বমোট ২৬ জন হতভাগ্য যাত্রীর মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনায় পুরো রাজবাড়ী জেলা জুড়ে বর্তমানে এক শোকাবহ ও স্তব্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।


