শেরপুরে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ১৮০ ডিগ্রি মোড়: নেপথ্যে কি শতকোটি টাকার মূর্তি?

বগুড়ার শেরপুরে রাজমিস্ত্রি শরিফ শেখকে (৩৪) অপহরণের অভিযোগে তাঁর স্ত্রী সাদিয়া খাতুন থানায় মামলা করেছেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর করা এ মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৭–৮ জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে মোঃ মিঠু হোসেনকে (৪০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২৫ সেপ্টেম্বর রাত আটটার দিকে স্থানীয় মোটর শ্রমিক নেতা মোঃ রেজাউল কবির (কবির নেতা) শরিফকে হাঁপুনিয়া বাজারে নিয়ে যান। এরপর থেকেই শরিফের কোনো সন্ধান মিলছিল না। স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাদিয়া খাতুন ২৯ সেপ্টেম্বর শেরপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে তিনি কবিরের কাছ থেকে জানতে পারেন, ঘটনার রাতে তাঁরা দুজন হাঁপুনিয়া বাজারে গেলে নাহিদ নামের এক ব্যক্তির দোকানের সামনে থেকে একদল সন্ত্রাসী তাঁদের চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায়। সন্ত্রাসীরা কবিরকে ছেড়ে দিলেও শরিফকে আটকে রাখে।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে সাদিয়া বাদী হয়ে শেরপুর পৌরসভার টাউন কলোনি এলাকার রাসেল বাবু হিমু (৪৩), মোঃ রাকিব (৩৫), মিঠু হোসেন (৪০) ও মোঃ মাসুদ (৩৬) সহ ১২ জনের বিরুদ্ধে শেরপুর থানায় অপহরণ মামলা করেন। ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে পৌর শহরের মহাসড়কের পাশ থেকে (মজিবর রহমান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে) শরিফকে উদ্ধার এবং মিঠু হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

কাগজে-কলমে ঘটনাটি একটি সাধারণ অপহরণ মামলা মনে হলেও এর ভেতরের অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে এজাহারের বিবরণের সাথে শরিফের নিজের বক্তব্যের বড় ধরনের অমিল ও নাটকীয় মোড় দেখা গেছে। কথিত নিখোঁজ থাকা অবস্থায় শরিফ ও মাসুদের দেওয়া বক্তব্যের একটি ভিডিও রেকর্ড থেকে বেরিয়ে আসে ৫৫ কেজি ওজনের একটি প্রাচীন কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি ও কথিত ‘১০০ কোটি টাকা’ দরদামের অন্ধকার অধ্যায়।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালে বগুড়া জেলা কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় শাজাহানপুর উপজেলার খাদাশ রাজবাড়ি গ্রামের অনিল চন্দ্রের সাথে শরিফের পরিচয় হয়। অনিল তখন একটি হত্যা মামলায় কারাগারে ছিলেন। সেখানে অনিল শরিফকে জানান, তাঁর কাছে একটি বড় আকারের বিষ্ণুমূর্তি রয়েছে। পরবর্তীতে উভয়েই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় যোগাযোগ করেন। একপর্যায়ে শরিফ অনিলের বাড়ি থেকে মূর্তিটি এনে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখেন এবং অনিলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এরপর তিনি যুক্ত হন দূরপাল্লার চালক মাসুদ রানার সাথে। কিছুদিন পর তাঁরা মূর্তিটির একটি নমুনা নিয়ে ঢাকায় কথিত ক্রেতার সঙ্গে দেখা করেন। নমুনাটি রাসায়নিক পরীক্ষায় মানসম্মত প্রমাণিত হওয়ায় ক্রেতারা সেটির দাম ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেন বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এ ঘটনার পরদিনই শরিফ মাসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নিয়ে মূর্তিটিসহ উধাও হয়ে যান এবং যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
ভিডিওতে শরিফ জানান, মাসুদের কাছ থেকে সরে এসে তিনি বগুড়া শহরের খান্দার এলাকার একটি বেসরকারি ক্লিনিকের মালিক বুলবুল হাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বুলবুল সম্পর্কে শরিফের মামা হন। তাঁরা দুজন মিলে মূর্তিটি বিক্রির পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বুলবুলকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে না পেরে শরিফ বিষয়টি শেরপুরের হামছায়াপুর এলাকার মোটর শ্রমিক নেতা রেজাউল কবিরকেও জানান। পরবর্তীতে তিনজন মিলে মূর্তি বিক্রির জন্য একাধিকবার বৈঠক করেন।
শরিফের দাবি, ২০২০ সালে কবির ও বুলবুল হাজী যৌথভাবে মূর্তিটি তাঁর কাছ থেকে নিজেদের হেফাজতে নেন। এর প্রায় এক বছর পর শরিফ জানতে পারেন, মূর্তিটি ১০০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়ে গেছে, কিন্তু তাঁকে কোনো ভাগ দেওয়া হয়নি। টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করলে তাঁরা শরিফকে দফায় দফায় কয়েক লাখ টাকা দেন। আরও বেশি টাকা দাবি করলে শরিফকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। প্রাণভয়ে শরিফ স্ত্রীকে নিয়ে ফরিদপুরে পালিয়ে যান। সেখান থেকে আবারও তিনি বুলবুল হাজীর সাথে যোগাযোগ করে তথ্য ফাঁসের হুমকি দিলে বুলবুল তাঁকে কিছু টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ইটভাটার পাশে দুই বিঘা জমি লিখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
এরপর ২০২৩ সালে শেরপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শরিফকে হঠাৎ দেখতে পান মাসুদ রানা। শরিফ একটি প্রাইভেট কারে তাঁর ছোট বোনকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন। তখন মাসুদ পথ আটকে আগের ধারের ১০ হাজার টাকা ও মূর্তি বিক্রির অংশের টাকা দাবি করলে তাঁদের মধ্যে বাক্বিতণ্ডা হয়। শরিফ তাৎক্ষণিক ফোন দিলে কবির নেতা এসে মাসুদকে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করে শরিফকে সেখান থেকে ছাড়িয়ে নেন।
গত ২৫ সেপ্টেম্বরের ঘটনা প্রসঙ্গে ভিডিওতে শরিফ দাবি করেন, সেদিন কবির নেতা জরুরি কাজের কথা বলে মোটরসাইকেলে করে তাঁকে হাঁপুনিয়ায় শ্বশুরবাড়ির সামনে থেকে তুলে নেন। পরবর্তীতে তাঁকে হিমু, মাসুদ ও মিঠুসহ অপহরণ মামলার আসামিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। উদ্ধার হওয়ার আগপর্যন্ত শরিফ তাঁদের সঙ্গেই অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে মূর্তি বিক্রির টাকার সুরাহার জন্য কবিরের সাথে কয়েক দফা বৈঠকও হয়, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে তাঁর স্ত্রী থানায় অপহরণ মামলা করলে সন্ধ্যায় পুলিশ মজিবর রহমান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে শরিফকে উদ্ধার এবং মিঠু হোসেনকে গ্রেপ্তার করে।
শরিফের এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে শাজাহানপুর উপজেলার খাদাশ রাজবাড়ি এলাকায় খোঁজ নেওয়া হয়। সেখানে অনিল সরকারের ছেলে প্রসেনজিৎ জানান, আট বছর আগে তাঁর বাবা একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং প্রায় তিন বছর আগে মারা গেছেন। তবে কোনো বিষ্ণুমূর্তির বিষয়ে পরিবারের কেউ কিছু জানেন না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অতীতে ওই এলাকায় পুকুর খননের সময় ১০ বছর আগে একটি ছোট মূর্তি এবং তিন বছর আগে প্রায় ৬০ কেজি ওজনের একটি প্রাচীন কালো পাথরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল, যা পুলিশ নিয়ে যায়। তবে অনিলের কাছে কোনো মূর্তি ছিল কি না, তা তাঁদের জানা নেই।
অভিযোগের বিষয়ে বগুড়ার খান্দার এলাকার বুলবুল হাজীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, “শেরপুরের শরিফ বা কবির নামের কাউকে আমি চিনি না। আমাকে জড়িয়ে এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।”
অন্যদিকে, মোটর শ্রমিক নেতা রেজাউল কবির ২০২৩ সালের বাসস্ট্যান্ডের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও মূর্তির কারবারে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেন। তবে এজাহারের ‘অপহরণ’ তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “শরিফ আমার আত্মীয় হলেও মূর্তির বিষয়ে কিছু জানি না। কিন্তু প্রতিনিয়ত মাসুদ ও শরিফ কথিত মূর্তির টাকার জন্য আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। আমার ছেলে অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং করে একটি বহুতল ভবন তৈরি করেছে, অথচ তারা রটায় আমি নাকি মূর্তি বিক্রির টাকায় এটা করেছি। বিষয়টি নিয়ে গত ২৩ সেপ্টেম্বর একটি সালিসি বৈঠক হয় এবং ২৫ তারিখে আবারও বসার কথা ছিল। তাই আমি নিজেই শরিফকে বাড়ি থেকে তুলে এনেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে মাসুদ ও হিমুরা তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করেছে।”
সার্বিক বিষয়ে শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মঈনুদ্দীন বলেন, “আমরাও কথিত ১০০ কোটি টাকার মূর্তির কথা লোকমুখে শুনেছি। তবে এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ বা মামলা থানায় কেউ করেনি। বর্তমানে আমাদের কাছে থাকা সুনির্দিষ্ট অপহরণ মামলার তদন্ত চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

শেরপুর জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী শিবদাস কর্মকারের প্রয়াণ

শেরপুরে নির্বিঘ্ন দুর্গোৎসবে মতবিনিময় সভা

শেরপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত

শেরপুরে ইউএনওকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ফুলেল শুভেচ্ছা

শেরপুরে দুই বিএনপি নেতাকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের শুভেচ্ছা

শেরপুরে দিনেদুপুরে মাইক্রোবাসে স্কুলছাত্রী অপহরণ

শেরপুরে নানির বাড়িতে বেড়াতে এসে পুকুরে পড়ে শিশুর মৃত্যু

শেরপুরে ১০ সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’-এর আহ্বায়ক কমিটি গঠন

শেরপুরে আন্ডারপাসে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে সৌন্দর্যবর্ধন


