বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ছোনকা দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে সরকারি ক্ষতিপূরণের ৯৯ লাখ টাকা উত্তোলন ও তিন শতাধিক দোকানের ভাড়া নিয়ে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
গত ১০ মার্চ এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দায়ের করা লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিদ্যালয়টি সরেজমিনে তদন্ত করেছেন বগুড়া জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. রমজান আলী। ১৯৫৩ সালে স্থাপিত এই বিদ্যালয়ের প্রায় ২৭ বিঘা সম্পত্তি ও মহাসড়ক সম্প্রসারণের ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া ৯৯ লক্ষ ৬৯ হাজার টাকার ব্যয় নিয়ে এই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারী স্থানীয় অভিভাবক মো. আবেদ আলী, আবু সাইদ ও মো. মহসিন আলী সরকার তাদের অভিযোগে জানান, বিদ্যালয়ের জায়গা অধিগ্রহণ বাবদ সরকার প্রায় এক কোটি টাকা দিলেও প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম গোপনে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। স্কুলের তিন শতাধিক দোকান ঘর থেকে প্রতি মাসে ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকা ভাড়া আদায় হলেও তা স্কুলের ফান্ডে না রেখে হরিলুট করা হচ্ছে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক ফি আদায় করে সাধারণ অভিভাবকদের ওপর আর্থিক বোঝা চাপানো হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর বগুড়া এলএ শাখা থেকে ৯৯ লক্ষ ৬৯ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পায় বিদ্যালয়টি। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক খানের সময়ে সোনালী ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কয়েক দফায় মোট ৩১ লক্ষ ৯৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়ের তিন শতাধিক দোকানের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১৫-২০টি থেকে ভাড়া তোলা হচ্ছে এবং বাকি দোকানগুলো স্থানীয় ও শিক্ষকরা ভোগ করছেন। প্রতি বর্গফুট মাত্র ৪০ পয়সা হারে এসব দোকান থেকে মাসে সর্বমোট মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ভাড়া আসে বলে তিনি দাবি করেন। উত্তোলিত ৩২ লাখ টাকা বেঞ্চ তৈরি, নতুন ভবন নির্মাণ ও সংস্কার কাজে ব্যয় করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে অনুসন্ধানে উত্তোলিত সমপরিমাণ টাকা দিয়ে যে ধরনের উন্নয়ন কাজ হওয়া সম্ভব ছিল, সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে সংস্কার কাজের কোনো উল্লেখযোগ্য দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. দিলফুজার রহমান রিপন সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে জানান, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও পাঠদান কার্যক্রম গতিশীল করতে তারা কাজ করছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. রমজান আলী জানান, বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয় এবং উন্নয়ন কাজের নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে। আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
প্রতিষ্ঠানিটির বর্তমান সভাপতি ও শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু ুভ জানান, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম ও সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. দিলফুজার রহমানের নিয়োগ শুরু থেকেই বিতর্কিত। ইতিপূর্বে ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত এই নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে এবং সে সময় “৬০ লক্ষ টাকা নিয়োগ বানিজ্যের অভিযোগ” শিরোনামে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, সেসময় ৪টি পদের বিপরীতে ৬৩ লক্ষ টাকা ঘুষ লেনদেনের তথ্য সামনে আসে।
বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের নিয়োগকালীন সময়ে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন ফেরদৌস জামান মুকুল। বিতর্কিত নিয়োগ ও কোটি টাকার বাণিজ্য শেষে এখন সরকারি তহবিলের অর্থ লোপাটের নতুন অভিযোগের মুখে পড়েছেন এই শিক্ষকগণ।


