দেশজুড়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অবৈধ অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে এবার আরও কড়া অবস্থানে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা আসার পর রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় তালিকা ধরে অভিযান শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; বরং সংগঠিত নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে রাজধানীতে অভিযান জোরদার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ডিএমপি জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে মোট ৫৪৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগেই ধরা পড়েছেন ১৭৩ জন। গ্রেফতারদের মধ্যে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ যেমন রয়েছেন, তেমনি তালিকার বাইরের আরও বেশ কয়েকজনের নামও এসেছে তদন্তে। একই সময়ে ছিনতাই, সন্ত্রাস ও ডাকাতির অভিযোগে আরও বহুজনকে আটক করা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো তদবিরে কাজ হবে না। তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং তাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না। এমনকি কাউকে ছাড়িয়ে নিতে তদবির করা হলে তাকেও সংশ্লিষ্ট চক্রের অংশ হিসেবে দেখা হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান এখন দেশের সব মহানগর, জেলা ও রেঞ্জ পর্যায়ে চলছে। তালিকা হালনাগাদ করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা চাঁদাবাজ চক্রের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত হয়। র্যাবের একটি প্রতিবেদনে প্রায় ৬৫০ জন ‘চাঁদাবাজ গডফাদার’-এর তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪ হাজার ব্যক্তির একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে, যা ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
এই অভিযানের মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি হয়েছে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, শাসনগাছা বাস টার্মিনাল এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে তার সম্পৃক্ততা ছিল। যদিও গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবু ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে।
রাজধানীর মিরপুর এলাকায়ও বড় ধরনের চাঁদাবাজি নেটওয়ার্কের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। প্রতিদিন প্রতিটি দোকান থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে, শুধু এসব এলাকা থেকেই মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, এসব অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক কর্মী ও সন্ত্রাসী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। ফলে কেবল মাঠপর্যায়ের সদস্যদের নয়, পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেই অভিযান পরিচালনার চেষ্টা চলছে।


