অন্বেষণ ডেস্ক : দিনাজপুরে ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে একটি দ্রুতগামী ট্রেনকে রক্ষা করে সাহসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দিনমজুর এনামুল হক। সোমবার, ২৩ মার্চ সকালে বিরামপুর উপজেলার পূর্ব চণ্ডীপুর গ্রামে রেললাইনের একটি ভাঙা অংশ দেখে তিনি কলার মোচা দিয়ে লাল নিশানা তৈরি করে ট্রেনটি থামিয়ে দেন। ফলে নিশ্চিত বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় শত শত যাত্রীর প্রাণ।
ঘটনাটি ঘটে এদিন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে। ৬২ বছর বয়সী দিনমজুর এনামুল হক প্রতিদিনের মতো নিজ বাড়ির সামনে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন। সামনে এগোতেই হঠাৎ তার চোখে পড়ে রেললাইনের প্রায় এক হাত পরিমাণ অংশ সম্পূর্ণ ভাঙা।
এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে তিনি ঘাবড়ে না গিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি নিকটবর্তী রেলস্টেশনে জানাতে গ্রামের পরিচিত এক যুবককে মুঠোফোনে কল দেন। ঠিক তখনই ঘটতে শুরু করে আরেক বিপত্তি।
প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকে একটি দ্রুতগামী ট্রেনের হুইসেল স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির হয়ে ওঠেন। ট্রেনটিকে থামানোর জন্য তিনি আশপাশে লাল রঙের কোনো কাপড় খুঁজতে থাকেন।
কিন্তু আশপাশে কোথাও কোনো লাল কাপড় না পেয়ে তিনি দৌড়ে রেললাইনের পাশের কলাখেতে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তড়িঘড়ি করে কলাগাছ থেকে একটি কলার মোচা ছিঁড়ে নেন। তার এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে বহু মানুষের জীবন বাঁচানোর মূল হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এরপর মোচা থেকে লাল রঙের বড় খোসা খুলে একটি লাঠির মাথায় দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধেন তিনি। এই খোসাকেই লাল নিশানের মতো উঁচিয়ে ধরে রেললাইনের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যান এই সাহসী দিনমজুর।
তার সেখানে দাঁড়ানোর মাত্র পাঁচ মিনিট পরই দক্ষিণ দিক থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি সেখানে এসে পৌঁছায়। দূর থেকে লাল নিশান দেখতে পেয়ে চালক দ্রুত ব্রেক কষে ট্রেনটি থামিয়ে দেন। এনামুল হকের এমন উপস্থিত বুদ্ধির কারণে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
ট্রেনটি থেমে যাওয়ার পর এর যাত্রী এবং রেললাইনের পাশে জড়ো হওয়া আশপাশের উৎসুক জনতা তাকে সাধুবাদ জানিয়ে হাততালি দেন। পুরো গ্রামবাসী এখন দিনমজুর ফজলুল হক সোনারের ছেলে এনামুল হকের এই মহৎ কাজ নিয়ে চরম গর্ববোধ করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ রানা জানান, সহজ-সরল এই মানুষটির মানবিক চিন্তায় আজ বহু মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। শত শত যাত্রী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়ায় সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
নিজের এই কাজের বিষয়ে এনামুল হক বলেন, দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শুনে ঠিক থাকতে পারিনি। কীভাবে ট্রেনটি দুর্ঘটনা থেকে বাঁচানো যায়, সেই চিন্তায় দৌড়াদৌড়ি করছিলাম। আমার সামনে ট্রেনটি থামার পর খুব ভালো লেগেছে যে অনেক মানুষের জীবন বাঁচল।
অন্যদিকে, ফুলবাড়ি রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার শওকত আলী বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পরপরই রেলওয়ের পার্বতীপুর প্রকৌশলী দপ্তরকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। পরে প্রকৌশলী দলের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলওয়ের ৩৫২/৫ থেকে ৩৫২/৬ নম্বর মাইলপোস্টের মাঝামাঝি অংশে রেললাইনের ওই ভাঙা অংশটি মেরামত করেন। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রেন চলাচলের সময় অতিরিক্ত চাপে হয়তো রেললাইনের ওই অংশ আগে থেকেই ভেঙে গিয়েছিল।
মেরামত কাজ শেষ হওয়ার পর আধা ঘণ্টা দেরিতে ট্রেনটি গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এনামুল হকের এই মানবিক কাজের কারণে বড় ধরনের ট্র্যাজেডি এড়ানো গেছে এবং বর্তমানে ওই রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।


