বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সোমবার (১৮ মে) বাজার থেকে আরও ১০ কোটি মার্কিন ডলার ক্রয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং বাজারে ডলারের যৌক্তিক ভারসাম্য আনতেই এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আজ দেশের ছয়টি প্রথম সারির বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে এই ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের নির্ধারিত নিয়ম মেনে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে কেনা হয়েছে।
ফলে চলতি মে মাসের প্রথম ১৮ দিনেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, পরিসংখ্যান বলছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে মোট ৫৯৮ কোটি ৩৫ লাখ ডলার কিনেছে। সাধারণত যেসব ব্যাংকের কাছে রেমিট্যান্স বা রফতানি আয়ের কারণে অতিরিক্ত ডলার জমা হয়, তাদের কাছ থেকেই এটি কেনা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি ডলারের বাজারে যাতে কোনো ধরনের অস্থিরতা বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে না পারে, সেদিকে নিবিড় নজরদারি রাখা হচ্ছে।
তবে শুধু ডলারের মজুত বাড়ানোই এই উদ্যোগের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজারে দেশীয় মুদ্রার তারল্য প্রবাহও নিশ্চিত করা হয়। কারণ, বাজার থেকে ডলার কেনার বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সমপরিমাণ টাকার জোগান দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বৈধ পথে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ আশানুরূপভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ার কারণে অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে এখন পর্যাপ্ত ডলার উদ্বৃত্ত থাকছে, যা তারা সহজেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে পারছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই উদ্বৃত্ত ডলার বাজারদর অনুযায়ী কিনে নেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ে এবং বাজারে টাকার প্রবাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে ডলারের সরবরাহ এবং চাহিদার মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন নিয়মিত হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। বিশেষ করে রফতানি আয় বাড়লে দেশের ব্যাংকগুলোতে ডলারের সরবরাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বেড়ে যায়।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গত কয়েক বছর দেশে ডলারের দামে বেশ অস্থিতিশীলতা ও সংকট দেখা গিয়েছিল। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানামুখী কড়াকড়ি, হুন্ডি প্রতিরোধে ব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারির কারণে মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত পদক্ষেপের ফলে আগামী দিনগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার আরও বেশি স্থিতিশীল হবে। একইসঙ্গে এর ফলে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।


