বাংলাদেশে রথযাত্রা উৎসব ও সম্প্রীতি

আবহমান বাংলার হাজার বছরের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সর্বজনীনতা। এ দেশের মাটিতে ধর্মের চেয়ে উৎসবের আনন্দ চিরকালই সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বেশী গেঁথে বসেছে।
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’এই অমোঘ ও চিরায়ত বাণীটি বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় কেবল কোনো চটকদার স্লোগান নয়, বরং এটি এ দেশের মানুষের রক্তে মিশে থাকা এক পরম সত্য। এই সত্যেরই অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ ও বর্ণিল বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রতি বছর আষাঢ়ের দ্বিতীয় তিথিতে উদযাপিত শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসবে।
ভারতের ওড়িশার পুরী ধাম জগন্নাথ সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র হলেও, ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক কারণে বাংলাদেশে এই উৎসবের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। শুধু বাংলাদেশই নয়, রথযাত্রাটি ইসকনের উদ্যোগে ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো শহরে সর্বপ্রথম শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশের বড় বড় শহরে রথযাত্রা উদযাপিতও হচ্ছে। এ দেশে রথযাত্রা কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় আচার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা রূপ নিয়েছে সব ধর্মের মানুষের এক পরম মিলনমেলায়, যা বাংলার বুকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এক অনন্য ইশতেহার।
বাংলাদেশে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসবের ইতিহাস শত শত বছরের পুরোনো। বিশেষ করে ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের পর থেকে বাংলায় এই সংস্কৃতির জোয়ার আসে। শ্রীচৈতন্যদেব প্রচার করেছিলেন ঈশ্বরের প্রতি অহৈতুকী প্রেম এবং মানবতাবাদ, যেখানে জাত-পাত, ধর্ম বা বর্ণের কোনো স্থান ছিল না। তাঁর এই পরম উদার দর্শনের কারণেই বাংলার মানুষ অত্যন্ত আপন করে নেয় জগন্নাথ সংস্কৃতিকে।
‘জগন্নাথ’ শব্দের অর্থ ‘জগতের নাথ বা প্রভু’। জগন্নাথ কোনো মন্দিরের চার দেওয়ালে অবরুদ্ধ থাকার দেবতা নন। তিনি পতিতপাবন; অর্থাৎ যিনি নিজেই ভক্তের কাছে, সাধারণ মানুষের কাছে নেমে আসেন। বছরের অন্যান্য সময় মন্দিরের গর্ভগৃহে সবার প্রবেশাধিকার না থাকলেও, রথযাত্রার দিন প্রভু জগন্নাথ তাঁর ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন।
তার কাছে উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো সবাই সমান। তাই জাতি-বর্ণ নির্বিশেষ সবাই এ রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। এভাবে সবার মধ্যে সৌহার্দ্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ববোধ তথা সামাজিক মেলবন্ধন গড়ে ওঠে এবং হিংসা-বিভেদহীন এক সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে এ রথযাত্রা।
জগন্নাথ দেবের বিগ্রহের অবয়ব অত্যন্ত অদ্ভুত ও রহস্যময়। তাঁর বড় বড় গোলাকার চোখ সবসময় উন্মুক্ত, যা জগতের প্রতিটি জীবের প্রতি তাঁর সমদৃষ্টি ও অতন্দ্র করুণার প্রতীক। তাঁর হাত বা পা প্রথাগত মূর্তির মতো নয়—যা নির্দেশ করে যে ঈশ্বর কোনো নির্দিষ্ট আকার বা পার্থিব সীমানার অধীন নন। জগন্নাথ সংস্কৃতির আরেকটি মূল ভিত্তি হলো ‘মহাপ্রসাদ’।
পুরীর আনন্দ বাজারে যেভাবে জাত-পাতের বিচার না করে সবাই এক সাথে বসে এই অন্ন গ্রহণ করেন, সেই সাম্যের দর্শন বাংলাদেশের জগন্নাথ ভক্তদের মাঝেও বিদ্যমান।
বাংলাদেশের রথযাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ঐতিহ্যবাহী নাম হলো ঢাকার ধামরাইয়ের শ্রী শ্রী জগন্নাথ রথযাত্রা। প্রায় চারশত বছরের প্রাচীন এই রথযাত্রাটি কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং গোটা উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সমাবেশ।
এছাড়া কুমিল্লার জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা, সিলেটের আন্তর্জাতিক রথযাত্রা উৎসব এবং কুষ্টিয়া, পাবনা, খুলনা ও চট্টগ্রামের রথযাত্রাসমূহ এ দেশের লোকসংস্কৃতির এক একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উৎসবগুলোর ঐতিহাসিক বিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এগুলো কখনোই একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ ছিল না।
জমিদার আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত, রথযাত্রার আয়োজন ও উদযাপনে সর্বস্তরের মানুষের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ একে এক অনন্য সামাজিক রূপ দান করেছে।
বাংলাদেশে রথযাত্রা উৎসবের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘রথের মেলা’। মেলা শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থই হলো মিলন। রথযাত্রা উপলক্ষে দেশের প্রতিটি ছোট-বড় আয়োজনেই মেলা বসে, যা সপ্তাহব্যাপী বা পক্ষকালব্যাপী স্থায়ী হয়। এই মেলাগুলো ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে এক পরম লোকজ উৎসবে রূপান্তরিত হয়।
গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতির এই মেলাগুলোতে ধর্ম-বর্ণের কোনো বিভেদ থাকে না। মেলায় মাটির পুতুল, তৈজসপত্র, বাঁশ ও কাঠের তৈরি নান্দনিক আসবাবপত্র, লোহার সামগ্রী, কাঁচের চুড়ি, রঙিন ফিতে এবং মুখরোচক পাঁপড় ভাজা, জিলিপি, খই-বাতাসার পসরা সাজিয়ে বসেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এই বিক্রেতাদের একটি বিশাল অংশ আসেন মুসলিম সম্প্রদায় থেকে। অন্যদিকে মেলায় কেনাকাটা করতে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়েও থাকে সব ধর্মের মানুষের সমাগম।
মুসলিম পরিবারের মা-বাবারা তাঁদের সন্তানদের হাত ধরে মেলায় আসেন, মাটির খেলনা কিনে দেন, জিলিপি-পাঁপড় খেয়ে আনন্দ উপভোগ করেন। এখানে এসে ধর্মীয় পরিচয়টি গৌণ হয়ে যায় এবং বাঙালি লোকসংস্কৃতির চিরন্তন রূপটি মুখ্য হয়ে ওঠে। রথের মেলা এভাবে কেবল মানুষের মনের দূরত্বই ঘুচিয়ে দেয় না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং স্থানীয় লোকশিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের ধামরাইয়ের রথযাত্রার দিকে তাকালে সম্প্রীতির এক পরম বাস্তব রূপ দেখা যায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ধামরাইয়ের ঐতিহাসিক কাঠের তৈরি বিশাল রথটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর, এই রথ পুনঃনির্মাণ এবং উৎসবকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সকল ধর্মের মানুষ ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল অনন্য।
বর্তমান সময়েও ধামরাইয়ে রথযাত্রার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মেলা ব্যবস্থাপনা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথিদের আপ্যায়নে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের যুবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন, তা সারাবিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
অনুরূপ চিত্র দেখা যায় কুমিল্লা বা সিলেটেও। রথ যখন শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে, তখন রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে অন্য ধর্মের মানুষও হাত নেড়ে বা শ্রদ্ধা মিশ্রিত কৌতূহলে এই শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানান।
বহু জায়গায় রথযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন মুসলিম জনপ্রতিনিধি বা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ। এই যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং একে অপরের আনন্দকে নিজের করে নেওয়ার মানসিকতা—এটাই হলো প্রকৃত বাংলাদেশের পরিচয়।
আজকের একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে যখন নানা সময়ে উগ্রবাদ, পরমতঅসহিষ্ণুতা এবং সংকীর্ণ সামাজিক মানসিকতা আমাদের চারপাশকে কলুষিত করতে চাচ্ছে। তখন জগন্নাথ দেবের এই সর্বজনীন ও উদার দর্শন আমাদের আলোর পথ দেখায়। তিনি আমাদের শেখান যে, মানুষকে ভালোবাসার চেয়ে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় কোনো ধর্ম হতে পারে না। বাংলাদেশে রথযাত্রা উৎসবের মাধ্যমে প্রতি বছর এই মানবিক শিক্ষারই পুনরাবৃত্তি ঘটে।
যদিও এবছর রথযাত্রার সাড়ম্বর উৎসব বন্ধ, শান্তি বিনষ্ট ও মন্দিরের বাহিরে যেন নানা আসে এমন হুমকী-ধামকী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে একটি তাওহিদি জনতাসহ বিভিন্ন উগ্রবাদ ইসলামী নামধারীরা। যাতে করে বাংলাদেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়।
সেদিক লক্ষ করে বর্তমান সরকারে পক্ষে এ বছর ১৬ জুলাই রথযাত্রা ও ২৪ জুলাই উল্টো রথযাত্রা পর্যন্ত ৯দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নানা পদক্ষেপ গ্রহন ও নির্দেশনা দিয়েছেন। রথযাত্রায় পিকেট পার্টি, টহল পার্টি, সিসিটিভি ক্যামেরা, ফুট পেট্রোল, রুফটপ পার্টি, হোন্ডা মোবাইল, ডিবি টিম, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা টিম, সোয়াট টিম, বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও ট্রাফিক পুলিশসহ পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
রথযাত্রা নির্ধারিত রুটে ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা, নামাজ ও আজানের সময় লাউড স্পিকার/মাইক বাজানো থেকে বিরত থাকা, নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, ব্যাগ-পোটলাসহ রথযাত্রায় অংশগ্রহণ না করা, সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু দেখলে পুলিশকে জানানোর জন্য আয়োজক নেতৃবৃন্দদের অনুরোধ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ ও নির্দেশনা শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, সারাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরা বাস্তবায়নে অগ্রনী ভূমিকা পালন করবে। যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুসংহত হয়।
সম্প্রীতির এই রথযাত্রা বিশ্বাসের ভিন্নতা প্রকৃতিরই নিয়ম। তাওহিদি ইসলামের একত্ববাদী চেতনা এবং জগন্নাথ সংস্কৃতির সর্বজনীন উৎসবমুখরতা দুইয়ের মাঝে তত্ত্বের দিক থেকে আকাশ-পাতাল তফাত থাকতে পারে, কিন্তু মানবতার দিক থেকে উভয়ের লক্ষ্যই হলো সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। বাইরের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা মূর্তি-কেন্দ্রিক বিতর্ক যেন এ দেশের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে আমাদের সর্বদা সজাগ থাকতে হবে।
বাংলাদেশে রথযাত্রা উৎসব কেবল একটি বাৎসরিক ধর্মীয় দিনপঞ্জির আনুষ্ঠানিকতা মাত্র নয়; এটি মানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক পরম সাংস্কৃতিক মিলন উৎসব। এতে হৃদয়ের সংকীর্ণতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে, একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
রথের চাকা যেভাবে প্রগতির প্রতীক, আমাদের সামাজিক সম্প্রীতির এই অভিযাত্রাও যেন সমস্ত কৃত্রিম বাধা ও উত্তেজনাকে মাড়িয়ে চিরকাল সামনের দিকে এগিয়ে চলে-এটাই হোক আজকের দিনের প্রত্যাশা। আবহমান বাংলার এই সম্প্রীতির সুবাতাস যুগে যুগে অক্ষুন্ন থাকুক। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ এক অনন্য মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গৌরবান্বিত হক এটাই আজকের প্রত্যাশা।
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

নাটোরে নারীর গোপন ভিডিও ধারণ, ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে মাওলানা মিরাজ গ্রেপ্তার

চাচির গোসলের গোপন ভিডিও ধারণ করে ভাইরালের হুমকি, যুবক আটক


