বেহুলার গল্প থেকে নবদুর্গার রূপ, ২৭৭ প্রতিমায় সাজছে হরি মন্দির

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় দুর্গাপূজার মণ্ডপজুড়ে যেন পৌরাণিক কাহিনির এক বিশাল চিত্রপট। কোথাও মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলার উপাখ্যান, কোথাও নবদুর্গার নানা রূপ ও জীবনকাহিনি। সারি সারি ২৭৭টি প্রতিমায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পুরাণ, লোকজ ঐতিহ্য ও বাংলার সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দেখতে প্রতিবছর ভিড় করেন হাজারো নয়, লাখো দর্শনার্থী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ, এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও আসেন অনেকে।
আলফাডাঙ্গা পৌরসভার কুসুমদি গ্রামের কেন্দ্রীয় শ্রী শ্রী হরি মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা নির্মাণ ও রঙের কাজ শেষ হয়েছে। মণ্ডপের প্যান্ডেল, আলপনা এবং আলোকসজ্জার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকেরা। তাঁদের প্রত্যাশা, এবার প্রতিমার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বর্ণিল সাজসজ্জার কারণে দর্শনার্থীর উপস্থিতি আগের বছরগুলোর রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
প্রতিমায় প্রতিমায় পৌরাণিক কাহিনি
মন্দির কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে এখানে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আয়োজনের পরিধি বেড়েছে। গত বছর মণ্ডপে স্থান পেয়েছিল ২৫১টি প্রতিমা। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৭৭।
প্রতিমাগুলোর বিশেষত্ব শুধু সংখ্যায় নয়, বিষয়বৈচিত্র্যেও। মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলার কাহিনি থেকে শুরু করে নবদুর্গার জীবনকথা—বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যানকে প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন শিল্পীরা। প্রতিটি দৃশ্যের নির্মাণ ও উপস্থাপনায় রয়েছে আলাদা ভাবনা। দর্শনার্থীরা যেন প্রতিমা দেখার পাশাপাশি পরিচিত হতে পারেন বাংলার পৌরাণিক কাহিনি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে, সেই লক্ষ্যেই এ আয়োজন।
সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার মৃৎশিল্পী নিরঞ্জন দাস ও সুব্রত দাস ছয়জন সহকারীকে নিয়ে টানা দুই মাস ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন। মাটির কাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে রং ও নকশার কাজ, প্রতিটি ধাপেই ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি। প্রতিমার কাজ শেষ হলেও মণ্ডপের সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ততা এখনো কাটেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দির প্রাঙ্গণে চলছে প্যান্ডেল নির্মাণ ও আধুনিক আলোকসজ্জা স্থাপনের কাজ। বিভিন্ন থিম, নান্দনিক আলপনা এবং আলো-ছায়ার সমন্বয়ে পুরো আয়োজনকে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা চলছে। উৎসবের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে আয়োজকদের ব্যস্ততা।
ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে সম্প্রীতির মিলনমেলা
স্থানীয় বাসিন্দা উত্তম কুমার বিশ্বাস বলেন, কয়েক বছর ধরে হরি মন্দিরে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শুধু ফরিদপুর নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও মানুষ এই আয়োজন দেখতে আসেন। ভারত থেকেও ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে।
তাঁর ভাষ্য, এই মণ্ডপ এখন কেবল ধর্মীয় উৎসবের স্থান নয়; বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মিলনক্ষেত্র হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। পৌরাণিক কাহিনির শৈল্পিক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে বাংলার সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে।
মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, গত বছর এই আয়োজন দেখতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছিল। এবার প্রতিমার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তাই এবার কয়েক লাখ দর্শনার্থীর উপস্থিতি আশা করছেন তাঁরা। দেশের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও ভারত থেকে দর্শনার্থীরা আসবেন বলে তাঁদের প্রত্যাশা।
আয়োজকদের মতে, প্রতিমার বৈচিত্র্য এবং কাহিনিনির্ভর উপস্থাপনাই এই পূজার প্রধান আকর্ষণ। প্রতিবছর নতুন নতুন দর্শনার্থী এখানে আসেন। একই সঙ্গে পুরোনো দর্শনার্থীদের মধ্যেও আয়োজনটি ঘিরে আগ্রহ বাড়ছে।
নিরাপত্তায় সিসিটিভি ও স্বেচ্ছাসেবক দল
বিপুল জনসমাগমের বিষয়টি মাথায় রেখে নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। দর্শনার্থীদের চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেও নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হচ্ছে।
মন্দিরের আহ্বায়ক চিকিৎসক সুমন রায় বলেন, প্রতিমা প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরাই তাঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য। দর্শনার্থীরা যেন নিরাপদে ও সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিমা দেখতে পারেন, সে জন্য পুরো এলাকা সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী জানান, বিপুল জনসমাগম ও বড় আয়োজন ঘিরে মণ্ডপ এবং এর আশপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন ও মণ্ডপ কমিটির পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে।
ফরিদপুরে ৭৮১ মণ্ডপে দুর্গাপূজা
জেলা সদরসহ ফরিদপুরের নয়টি উপজেলায় এবার ৭৮১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, এর মধ্যে ১৪৭টি মণ্ডপকে অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং ২৪২টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি মণ্ডপগুলো সাধারণ হিসেবে তালিকাভুক্ত।
এই আয়োজনের মধ্যে আলফাডাঙ্গার কুসুমদি গ্রামের হরি মন্দিরের ২৭৭ প্রতিমার প্রদর্শনী আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি শিল্প, লোককথা ও ঐতিহ্যকে এক আঙিনায় তুলে ধরার এই উদ্যোগ স্থানীয় পরিচিতি ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরেও আগ্রহ তৈরি করেছে। আয়োজকদের আশা, উৎসবের দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠবে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ।
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

দক্ষিণ কোরিয়ায় মানবাধিকার সম্মেলনে যোগ দিতে দেশ ছাড়লেন আসিফ মাহমুদ

নষ্ট ডিমে কেক-বিস্কুট তৈরি, বগুড়ার ফুলকলি বেকারি দণ্ডিত

শেরপুরে গাড়ি ছিনতাই সাথে জড়িত নারীসহ চারজন গ্রেফতার

মুখ্যমন্ত্রী হয়েই বিনামূল্যে ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের ঘোষণা থালাপতি বিজয়ের

ফরিদপুরে আকিকার মিষ্টি খেয়ে ৮ শিশু হাসপাতালে

ফরিদপুরে মাকে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা, ছেলে গ্রেফতার

ফরিদপুরে বাস-অ্যাম্বুলেন্স মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৫

খালি গায়ে কৃষকের ছদ্মবেশে ডাকাত ধরলেন পুলিশ কর্মকর্তা

ফরিদপুরে বন্ধ পাম্প থেকে ৫৪ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার, জরিমানা

