বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী আজ

দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে এক অসম সাহসী অভিযানে নেমেছিলেন তিনি। লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের বিমান নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয় তাঁকে। তবে তাঁর আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম ও সাহসিকতা বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁকে দিয়েছে চিরস্থায়ী স্থান। তিনি বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। আজ ২৯ অক্টোবর তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী।
১৯৪১ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোডের মোবারক লজে জন্মগ্রহণ করেন মতিউর রহমান। তাঁর পৈতৃক বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামে, যা বর্তমানে মতিনগর নামে পরিচিত। শৈশব থেকে শুরু করে সামরিক জীবনের নানা অধ্যায় পেরিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা তাঁকে দেশের শ্রেষ্ঠ বীরদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মতিউর রহমান ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৭ সালে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন তিনি। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু হলে তাঁর অবস্থান কেবল সামরিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায়ও তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় হন। বাঙালি যুবকদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে ভৈরবে একটি গোপন প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে বিমান নিয়ে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকেন তিনি।
১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট। পাকিস্তানের করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটি থেকে একটি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে আকাশে ওড়েন মতিউর রহমান। উদ্দেশ্য ছিল বিমানটি নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া।
তবে সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি প্রশিক্ষণার্থী পাইলট রশিদ মিনহাজের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে বিমানটি সিন্ধু প্রদেশের থাট্টা এলাকার কাছে বিধ্বস্ত হয়। প্রাণ হারান মতিউর রহমান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯ বছর।
একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে তাঁর এই মৃত্যু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে আছে। নিজের পেশাগত অবস্থান, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জীবনের মায়ার ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে মুক্ত করার যে প্রত্যয় তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজও স্মরণ করা হয় গভীর শ্রদ্ধায়।
শহীদ হওয়ার পর মতিউর রহমানকে পাকিস্তানের করাচিতে সমাহিত করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন ২৫ জুন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনঃসমাহিত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
ব্যক্তিজীবনে ১৯৬৮ সালে মিলি খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মতিউর রহমান। তাঁদের দুই মেয়ে—মাহিন ও তুহিন।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জীবন কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তার আত্মত্যাগের কাহিনি নয়; এটি স্বাধীনতার প্রতি অবিচল অঙ্গীকারেরও ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে দেশের পক্ষে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত এবং সেই লক্ষ্যে জীবন উৎসর্গ করার ঘটনা তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তাই স্মরণ করা হয় এমন এক বীরকে, যাঁর কাছে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিল ব্যক্তিগত জীবনের চেয়েও বড়। তাঁর সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা, জড়িতদের পরিণতি ভোগ করতে হবে: তথ্য উপদেষ্টা

বাবার বিরুদ্ধে মাকে নির্যাতনের অভিযোগ তাশরীফের, ভরণপোষণ নিয়ে যা বললেন

রূপপুরে পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের দ্বিতীয় চালান

বাংলাদেশ-জাপান অংশীদারত্ব হোক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির হাতিয়ার: প্রধানমন্ত্রী

মা ইলিশ রক্ষায় নদী-সমুদ্রে কোস্ট গার্ডের কড়া নজরদারি

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপান যাচ্ছি: আমজনতার তারেক রহমান

ভূমিমন্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে গেলেন রাষ্ট্রপতি

আজ জাতীয় শাশুড়ি দিবস

বিশ্ব পোলিও দিবস উপলক্ষে রোটারি ইন্টারন্যাশনালের বর্ণাঢ্য র্যালি

