আজ জাতীয় শাশুড়ি দিবস

পরিবারে নতুন সম্পর্কের সূচনা হলে বদলে যায় অনেক সমীকরণ। ছেলে বা মেয়ের বিয়ের মধ্য দিয়ে পরিবারের সদস্য বাড়ে, তৈরি হয় নতুন বন্ধন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা মানুষগুলোর একজন শাশুড়ি। কখনো তিনি অভিভাবক, কখনো পরামর্শদাতা, আবার কখনো হয়ে ওঠেন পুত্রবধূর নির্ভরতার জায়গা। শাশুড়িদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর অক্টোবরের শেষ রোববার পালিত হয় জাতীয় শাশুড়ি দিবস। সে হিসাবে আজ রোববার, ২৫ অক্টোবর, দিবসটি পালিত হচ্ছে।
মা দিবসে যেমন মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি শাশুড়ি দিবসও পরিবারের এই বিশেষ মানুষটির অবদান স্মরণ করার উপলক্ষ। সংসারের নানা প্রয়োজনে পাশে থাকা, নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা করা কিংবা অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দেওয়া—অনেক পরিবারেই শাশুড়ির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ছোট ছোট যত্ন ও সহযোগিতা পরিবারের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলতে পারে।
তবে শাশুড়ি ও পুত্রবধূর সম্পর্ক সব সময় একই রকম হয় না। কোথাও প্রথম পরিচয় থেকেই গড়ে ওঠে আন্তরিকতা, আবার কোথাও পরস্পরকে বুঝে নিতে সময় লাগে। বয়স, অভ্যাস, পারিবারিক সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের ধরনে পার্থক্য থাকলে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। সম্পর্ক সুন্দর রাখতে তাই দুজনেরই প্রয়োজন ধৈর্য, শ্রদ্ধা ও খোলামেলা যোগাযোগ।

সন্তানের বিয়ের পর মায়ের জীবনেও নতুন বাস্তবতা আসে। যে সন্তানকে এত দিন নিজের মতো করে আগলে রেখেছেন, তার জীবনে নতুন একজন মানুষের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব ও সম্পর্কের ধরন বদলে দেয়। কখনো মায়ের মনে হতে পারে, সন্তান আগের মতো সময় দিচ্ছে না কিংবা সংসারে তাঁর গুরুত্ব কমে গেছে। অন্যদিকে, পুত্রবধূও নতুন পরিবেশে নিজের জায়গা তৈরি করতে গিয়ে চাপ অনুভব করতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ মেনে নেওয়া জরুরি। সন্তানের জীবনে জীবনসঙ্গীর উপস্থিতি মায়ের প্রতি ভালোবাসা কমিয়ে দেয় না। একইভাবে, শাশুড়ির অভিজ্ঞতা ও অবদানকে সম্মান জানানো মানেই পুত্রবধূকে নিজের মতামত বা স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে, এমন নয়।
কিছু পরিবারে মতের অমিল ধীরে ধীরে মানসিক চাপ ও বিরোধের কারণ হয়ে ওঠে। কখনো অপমানজনক কথা, অযাচিত হস্তক্ষেপ কিংবা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধ শারীরিক নির্যাতন পর্যন্ত গড়ায়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আগের প্রজন্মের নারীদের অনেকেই শ্বশুরবাড়িতে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু অতীতে কষ্ট পাওয়ার অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি একই আচরণের যুক্তি হতে পারে না। বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন বউকে সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বস্তির পরিবেশ দেওয়ার শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। একজন শাশুড়ি চাইলে পরিবারের পুরোনো নেতিবাচক চর্চা ভেঙে সম্পর্কের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারেন।
শাশুড়ি ও পুত্রবধূর সম্পর্ক নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী কীরা অ্যালেনডর্ফের একটি গবেষণায় ভারতের একটি গ্রামের ২২টি পরিবারের ৪৬ জন সদস্যের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, এই সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বপূর্ণ নয়। কিছু পরিবারের নারীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও সহযোগিতা ছিল, আবার অন্যদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে কষ্টদায়ক কথাবার্তা ও যোগাযোগের ঘাটতি।
গবেষণাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একদিকে শাশুড়ি ও পুত্রবধূর কাছ থেকে পরস্পরকে আপনজন হিসেবে গ্রহণ করার প্রত্যাশা থাকে, অন্যদিকে পরিবারের ভেতরে তাঁদের দায়িত্ব ও অবস্থান এক নয়। এই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার পার্থক্য থেকেই অনেক সময় সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে।
২০১৯ সালে Social Work Research সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ছেলের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক এবং ছেলের দাম্পত্য জীবন নিয়ে মায়ের অনুভূতির সঙ্গে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার যোগসূত্র বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে মায়ের নিজেকে উপেক্ষিত মনে করার অভিজ্ঞতা পুত্রবধূর সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে উঠে আসে। তবে গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে করা; তাই এর ফল বাংলাদেশের সব পরিবারের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সন্তানের বিয়ের পর মায়ের ভূমিকা শেষ হয়ে যায় না, বরং সময়ের সঙ্গে তার ধরন বদলায়। নতুন দম্পতিকে নিজেদের মতো করে সংসার সাজানোর সুযোগ দেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজনের সময় পাশে থাকাও মূল্যবান। কোনো বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার আগে তাঁরা তা চান কি না, জেনে নেওয়া সম্পর্কের প্রতি সম্মান দেখানোর একটি উপায়।
অন্যদিকে, সন্তানদেরও মায়ের অনুভূতি ও অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নতুন সংসারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। মা ও জীবনসঙ্গীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে কারও পক্ষ না নিয়ে উভয়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সম্মানজনক সমাধান খোঁজা জরুরি।
যেভাবে বিশেষ করে তুলবেন শাশুড়ি দিবস
দিনটি উদযাপনের জন্য বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। আন্তরিক একটি কথা, ছোট উপহার কিংবা একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও শাশুড়ির মুখে হাসি ফোটাতে পারে।
পছন্দের খাবারের আয়োজন করুন: তাঁর পছন্দের খাবার রান্না করতে পারেন অথবা তাঁকে নিয়ে যেতে পারেন পছন্দের কোনো রেস্তোরাঁয়।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন: পরিবারের জন্য তাঁর করা কোনো ভালো কাজের কথা উল্লেখ করে ধন্যবাদ জানান।
একসঙ্গে সময় কাটান: পুরোনো স্মৃতি নিয়ে গল্প করুন, পারিবারিক ছবি তুলুন কিংবা তাঁর পছন্দের কোনো কাজ একসঙ্গে করুন।
সহযোগিতার হাত বাড়ান: সংসারের এমন কোনো কাজে সাহায্য করুন, যা তাঁর জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।
তাঁর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিন: বিশেষ কোনো রান্না বা পারিবারিক রীতি সম্পর্কে তাঁর কাছ থেকে জানতে চাইতে পারেন।
নিজের মতো থাকার সুযোগ দিন: ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ, মতামত ও স্বাধীনতাকেও সম্মান করুন।
শাশুড়ি দিবসের মূল কথা শুধু একটি দিন উদযাপন নয়; বরং পরিবারের এই সম্পর্কটিকে আরও আন্তরিক করে তোলার সুযোগ তৈরি করা। শাশুড়ি ও পুত্রবধূ—দুজনই যদি একে অপরের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেন, তাহলে প্রতিযোগিতা বা দূরত্বের বদলে গড়ে উঠতে পারে পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসা।
জাতীয় শাশুড়ি দিবসের সূচনা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আমেরিলো শহরে। স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক জিন হাও ১৯৩৪ সালের ৫ মার্চ প্রথমবারের মতো দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরে দিবসটি পালনের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়।
পরবর্তী সময়ে অক্টোবরের শেষ রোববারকে জাতীয় শাশুড়ি দিবস হিসেবে পালনের রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো পরিবারের এই সম্পর্কটির গুরুত্ব তুলে ধরা এবং শাশুড়িদের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করা।
একটি সুস্থ পরিবার গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। তাই আজকের দিনটি হতে পারে পুরোনো অভিমান সরিয়ে রেখে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার উপলক্ষ। শাশুড়িকে শুধু আত্মীয় হিসেবে নয়, পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান জানানোই হোক দিবসটির মূল বার্তা।
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

ভূমিমন্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে গেলেন রাষ্ট্রপতি

বিশ্ব পোলিও দিবস উপলক্ষে রোটারি ইন্টারন্যাশনালের বর্ণাঢ্য র্যালি

মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে গেলেন রাষ্ট্রপতি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ এনসিপি নেতা তানভীরুলের বিষপানে মৃত্যু

সেনাবাহিনীর ৭ ইউনিটকে জাতীয় পতাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে ২০ অক্টোবর রংপুর যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, কোনো দল বা ব্যক্তির নন: সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি

ফ্যামিলি কার্ডে অনিয়ম পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না: প্রতিমন্ত্রী টুকু

সালাহউদ্দিন আহমেদের জানাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

