কন্যাশিশুর স্বপ্নপূরণে পরিবার ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে: রাষ্ট্রপতি

কন্যাশিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, কন্যাশিশুর জন্ম কোনো বোঝা নয়; বরং তা নতুন সম্ভাবনা ও স্বপ্নের সূচনা। তার শিক্ষা মৌলিক অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
সোমবার (১২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের জন্য দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি শিশুবিয়ে বন্ধ করা, মেয়েদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং তাদের স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি কন্যাশিশুর জন্মের সঙ্গে একটি নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনার পথ তৈরি হয়। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের দক্ষ, সৃজনশীল ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক। নিজেদের যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পেলে তারা দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।

দুই কন্যার বাবা হিসেবে দেশের প্রতিটি কন্যাশিশুর মধ্যে নিজের সন্তানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বিষয়টি কেবল সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর মমতা ও মানবিকতা।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, মেধাবী কোনো ছাত্রীর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যাওয়া শুধু তার নিজের বা পরিবারের ক্ষতি নয়, পুরো জাতির জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি।
কন্যাসন্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর আহ্বান
রাষ্ট্রপতি বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধেও কন্যাসন্তানের প্রতি সম্মান ও দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা রয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আশ-শূরার ৪৯ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করে তিনি বলেন, কন্যাসন্তান আল্লাহর দান ও নেয়ামত। অথচ সমাজের অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের অবহেলা করা হয়, যা পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন ধর্মের নৈতিক শিক্ষায় নারী ও কন্যাশিশুর মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই মূল্যবোধকে পরিবার ও সমাজের আচরণে প্রতিফলিত করতে হবে।
এ বছরের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শিশুবিয়ের ফলে একটি শিশুর শৈশব নষ্ট হয়, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় এবং তার বিকাশের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হয়। এর সঙ্গে অকাল মাতৃত্ব, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শিশুবিয়ে বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং কন্যাশিশুর কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ছেলেদের মতো মেয়েদেরও সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে হবে। তারা বড় হয়ে কী হতে চায়, সেই প্রশ্ন করার পাশাপাশি স্বপ্ন পূরণের সুযোগও তৈরি করে দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনলাইন, সবখানে নিরাপত্তা জরুরি
কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিদ্যালয়ে যাতায়াত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, অনলাইন জগৎ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেন রাষ্ট্রপতি।
কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি হেল্পলাইন ১০৯, ১০৯৮ ও ৯৯৯ সম্পর্কে শিশু-কিশোর এবং তাদের পরিবারের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। বিপদের সময়ে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে এসব নম্বর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শিশুবিয়ে রোধে দারিদ্র্য কমানোর ওপর জোর
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য, দারিদ্র্য শিশুবিয়ের অন্যতম কারণ। তাই কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অবৈতনিক শিক্ষা, উপবৃত্তি, বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার এবং সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া গেলে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
এ ছাড়া জন্মনিবন্ধন যাচাই জোরদার, মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭৬ সালে নারী বিষয়ক দপ্তর এবং ১৯৭৮ সালে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে তা মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে রূপ নেয়।
তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য এবং মেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তির মতো উদ্যোগ নারীশিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান সরকারও কন্যাশিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকারের প্রতিটি উদ্যোগের সুফল যেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই মেয়েটির কাছেও পৌঁছায়, যে সীমিত সুযোগের মধ্যেও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। তার লিঙ্গপরিচয়, নিরাপত্তার অভাব কিংবা পরিবারের আর্থিক সংকট যেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটে ইউএস-বাংলার সব ফ্লাইট বাতিল

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু ১২ অক্টোবর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রচারের নির্দেশ

শিশুদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়ে মেধা বিকাশের পথ তৈরি করতে হবে: অর্থমন্ত্রী

স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তন হবে: জাহেদ উর রহমান

‘আপনারা এক পা এগিয়ে এলে আমিও দুই পা এগিয়ে যাব’: রাষ্ট্রপতির

সীমিত আয়ের মানুষের জন্য মানসম্মত বাসস্থান নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী

জনগণের কাছে নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর দায় স্বীকার করে কার্যকর পদক্ষেপ নিন: জামায়াত আমির

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি আসা নিয়ে কোনো সংকট নেই: তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী

