দীর্ঘ ২৮ বছর কারাভোগের পর অবশেষে মুক্তি পেলেন নওগাঁর এক বৃদ্ধা নারী। ১৯৯৮ সালের একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত রাহেলা বেগম সাজা শেষে পরিবারে ফিরেছেন মানবিক উদ্যোগে।
নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার দিঘা গ্রামের বাসিন্দা রাহেলা বেগম ১৯৯৮ সালে একটি হত্যা মামলার আসামি হন। মামলায় তৎকালীন আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এরপর গ্রেপ্তার হয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ কারাজীবন। স্বামী, সন্তান কিংবা নিজের কোনো ভিটেমাটি, কিছুই ছিল না তার। জেলখানার বাইরে বলতে গেলে একমাত্র বড় বোন সায়েলাই ছিলেন তাঁর ভরসা।
কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যেই কেটে যায় রাহেলার জীবনের প্রায় তিন দশক। গত ১২ জানুয়ারি তার যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ শেষ হয়। তবে আদালতের দেওয়া সাজার সঙ্গে থাকা সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা তখনও অনাদায়ী ছিল। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, এই টাকা পরিশোধ না হলে তাঁকে আরও প্রায় দুই বছর কারাভোগ করতে হবে। অসহায় রাহেলার পক্ষে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
পরিস্থিতি বিবেচনায় মানবিক সিদ্ধান্ত নেয় কারা কর্তৃপক্ষ। নওগাঁ জেলা কারাগারের তহবিল থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা পরিশোধ করেন জেল সুপার। এরপর রাহেলাকে তাঁর বোনজামাইয়ের জিম্মায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বর্তমানে রাহেলা বেগম তার বড় বোন সায়েলার বাড়িতে অবস্থান করছেন। বয়স প্রায় ৬৪ বছর। দীর্ঘ কারাভোগের কারণে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ও স্মৃতিশক্তি আগের মতো নেই। নিজের বোন ছাড়া চারপাশের মানুষ ও পরিবেশ তাঁর কাছে অনেকটাই অপরিচিত। কারাজীবনের কথা জানতে চাইলে আবেগ সামলাতে পারেন না তিনি। জেলের ভেতরে কাটানো প্রতিটি দিনই ছিল মুক্তির অপেক্ষায়, এর বেশি কথা বলার শক্তিও পান না রাহেলা।
বড় বোন সায়েলা জানান, বোনের জন্য তিনি আল্লাহর কাছে বহুবার কেঁদেছেন—অন্তত যেন জীবিত ফিরে আসে। অনেক সময় সেই আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। এত বছর পর বোনকে কাছে পেয়ে স্বস্তির কথা জানান তিনি। যে মামলায় রাহেলার সাজা হয়েছিল, তা নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও এখন আর সেই স্মৃতি মনে করতে চান না বলে জানান সায়েলা।
রাহেলার মুক্তির খবরে তাঁকে একনজর দেখতে আসছেন গ্রামবাসীরাও। তাদের ভাষ্য, ছোটবেলায় মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন রাহেলা, চলাফেরায় ছিলেন স্বাভাবিক। কিন্তু ২৮ বছর আগের রাহেলার সঙ্গে বর্তমান রাহেলাকে মিলিয়ে নিতে পারছেন না তারা।
নওগাঁ জেলা কারাগারের সুপার রতন রায় বলেন, রাহেলা বেগম ছিলেন কারাগারের সবচেয়ে প্রবীণ নারী কয়েদি। বিভিন্ন সময় তার খাওয়া-দাওয়া ও শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া হতো। যেহেতু তার যাবজ্জীবন সাজা শেষ হয়েছিল, তাই দ্রুত তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আগ্রহ ছিল কারা কর্তৃপক্ষের। সেই মানবিক বিবেচনা থেকেই জেল তহবিল থেকে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করা হয়।


