বগুড়ায় বাজারে সবজি-মাছে স্বস্তি, চাল-ডালের বাড়তি দামে বিপাকে মধ্যবিত্ত

বাজারে ঢুকলেই দামের ওঠানামার হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বগুড়ার ক্রেতারা। শীতের আগাম সবজি আসতে শুরু করায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, পটলসহ বেশ কিছু সবজির দাম কমেছে। মাছের বাজারেও মিলছে কিছুটা স্বস্তি। কমেছে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামও। কিন্তু এই স্বস্তির বিপরীত চিত্র চাল ও ডালের বাজারে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের বস্তায় বেড়েছে ৭০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। ডালের দামও বেড়েছে কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা।
ফলে বাজারের এক অংশে দাম কমার সুফল পেলেও অন্য অংশে বাড়তি খরচের বোঝা টানতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজারের হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর থেকে বগুড়া শহরের রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাজার, খান্দার বাজার ও কলোনি বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এসব বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে। মাছের ক্ষেত্রেও সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তন প্রভাব ফেলেছে। তবে চালের বাজারে পুরোনো মজুত কমে আসায় দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সপ্তাহের ব্যবধানে অর্ধেক দামে কিছু সবজি
শীতকালীন সবজির আগাম সরবরাহ বাজারে আসতে শুরু করায় বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এক সপ্তাহ আগেও যে ফুলকপি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন আকারভেদে তা পাওয়া যাচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। বাঁধাকপি ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা হয়েছে।
প্রতি কেজি পটল ও ঢেঁড়সের দাম ৬০ টাকা থেকে নেমে এসেছে ৩০ টাকায়। কাঁচা মরিচের দাম ১০০ টাকা থেকে কমে ৫০ টাকা হয়েছে। লম্বা বেগুন ৬০ টাকা থেকে ৩০ টাকা এবং দেশি বেগুন ১০০ টাকা থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড শসার দামও ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা হয়েছে।
এ ছাড়া করলা ৬০ টাকা থেকে কমে ৩০ টাকা, ধনেপাতা ২০০ টাকা থেকে ৮০ টাকা এবং টমেটো ১৮০ টাকা থেকে ১১০ টাকায় নেমেছে। আকারভেদে প্রতিটি লাউ পাওয়া যাচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। আগে একই লাউ বিক্রি হয়েছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।
সবজি বিক্রেতাদের মতে, বাজারে নতুন সবজির সরবরাহ বাড়তে থাকলে আগামী সপ্তাহে দাম আরও কমতে পারে।
মাছ, মুরগি ও ডিমে কমেছে খরচ
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাসের শেষ দিকে ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় মাছের বিক্রি কমেছে। এর সঙ্গে সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তন যুক্ত হয়ে কয়েক ধরনের মাছের দাম কমেছে।
বাজারে বড় রুই মাছ কেজিপ্রতি ৩৫০ টাকা থেকে কমে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট ও মাঝারি রুই ২৮০ টাকা থেকে নেমে এসেছে ২৫০ টাকায়। কাতলা ৪০০ টাকা থেকে কমে ৩৫০ টাকা, গ্রাসকার্প ৩২০ টাকা থেকে ২৯০ টাকা, কার্পজাতীয় মাছ ৩০০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২২০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
পাঙাশ মাছের দামে অবশ্য বাজারভেদে পার্থক্য দেখা গেছে। কোথাও কেজিপ্রতি ২২০ টাকা থেকে কমে ২০০ টাকা, আবার কোথাও আকার অনুযায়ী ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা কমেছে। ডিমের বাজারেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। লাল ডিমের হালি ৫০ টাকা থেকে কমে ৪৫ টাকা, হাঁসের ডিম ৬৪ টাকা থেকে ৬০ টাকা এবং দেশি মুরগির ডিম ৮৫ টাকা থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে মাছের দাম কমলেও গরু, মহিষ ও খাসির মাংসের বাজারে কোনো পরিবর্তন নেই। প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৫০ টাকা, মহিষের মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চালের বস্তায় বাড়তি সর্বোচ্চ ৪৫০ টাকা
সবজি ও মাছের বাজারে দাম কমার খবর থাকলেও চালের বাজারে স্বস্তির দেখা নেই। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২৫ কেজির বস্তায় বিভিন্ন জাতের চালের দাম ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে মৌসুমি বোরো চালের বস্তায় বেড়েছে ৪৫০ টাকা।
বাজারে এখন ২৫ কেজির আটাশ চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে দাম ছিল ১ হাজার ২৮০ টাকা। বিআর-২৯ চাল ১ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৩০ টাকা হয়েছে। নাজিরশাইল ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, কাটারিভোগ ১ হাজার ৯৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ১৫০ টাকা এবং মিনিকেট ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মৌসুমি বোরো চালের দাম। ২৫ কেজির বস্তা ২ হাজার ৩৫০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০০ টাকায়।
ফতেহ আলী বাজারের মেসার্স ইমন এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ মৌসুমে পুরোনো চালের মজুত প্রায় শেষের দিকে। পুরোনো চালের চাহিদা বেশি থাকায় দাম বেড়েছে। তবে তাঁর ধারণা, এই বাড়তি দাম দীর্ঘস্থায়ী হবে না; কয়েক দিনের মধ্যে কমতে পারে।
ডালের দামও বেড়েছে, অপরিবর্তিত মাংস
চালের পাশাপাশি ডালের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা বেড়েছে। মোটা মসুর ডাল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মসুর ডালের দাম রয়েছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে।
অন্যান্য নিত্যপণ্যের মধ্যে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা, দেশি রসুন ৮০ টাকা, চায়না রসুন ১৬০ টাকা এবং আদা ১৪০ টাকায়। ডায়মন্ড আলু ২০ টাকা ও দেশি আলু ৩০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
তেলের বাজারেও দাম কমার কোনো খবর নেই। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়। খোলা সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দাম ২০৮ টাকা।
‘সবজি কিনতে পারলে মাছ কিনতে পারি না’
বাজারে পণ্যের দামের এমন বৈপরীত্যে সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাঁদের অভিযোগ, কিছু পণ্যের দাম কমলেও চাল, ডাল ও মাংসের মতো প্রয়োজনীয় খাবারের বাড়তি দাম সেই স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে।
ফতেহ আলী বাজারে সবজি কিনতে এসে আব্দুর রশিদ মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বাজারের সবকিছুই নাগালের বাইরে। সবজির দাম আপাতত কমলেও অন্য জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাসের শেষে চাল কিনতে এসে দেখি, চালের দাম বেড়েছে।’
মাছ কিনতে আসা রাকিব আহমেদের অভিযোগ, পণ্যের দাম বাড়লে যেভাবে বাড়ে, কমার সময় সেভাবে কমে না। তিনি বলেন, ‘মাছের দাম কিছুটা কমেছে। কিন্তু মাংসের দাম আগের মতোই আছে। আবার চাল-ডালের দাম বাড়লে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়।’
কলোনি বাজারে সবজি কিনতে আসা ইমরুল কায়েস নিজের সংসারের হিসাব তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার। এখন তৃপ্তি মিটিয়ে খাবার খাওয়ার দিন শেষ। সবজি কিনতে পারলে মাছ কিনতে পারি না, মাছ কিনতে পারলে মাংস কিনতে পারি না।’
ফতেহ আলী বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আতাউর বলেন, মাসের শেষ সপ্তাহে ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকে। পাশাপাশি মাছের সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনের কারণে কয়েক ধরনের মাছের দাম কমেছে। তবে দাম কমার পরও বাজারে ক্রেতা কম বলে জানান তিনি।
সবজি বিক্রেতা সাজু মিয়ার জানান, চাহিদার তুলনায় ক্রেতা কম এবং শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়তে শুরু করায় দাম
বাজার তদারকি বাড়ানোর দাবি ক্যাবের
দ্রব্যমূল্যের ওঠানামা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ফজিলাতুন্নেছা ফৌজিয়া। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের দাম এখনো বেশি। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি কাঁচাবাজারের অল্প কয়েকটি পণ্যের দাম কমেছে, কিন্তু অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়েছে।
তাঁর মতে, মানুষের আয় ও দৈনন্দিন ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। ফলে ভোক্তারা এখনো স্বস্তিতে নেই।
বাজার তদারকির বিষয়ে তিনি জানান, ক্যাব ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। বগুড়াতেও শিগগিরই এ বিষয়ে কর্মসূচি নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বগুড়া জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসানকে ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

বগুড়ায় পুলিশের পরিচয়ে ১০২ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই, ৮৮ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার ৪

নন্দীগ্রামে মিনি ট্রাকের সঙ্গে ভটভটির সংঘর্ষ, হাসপাতালে দুই গরু ব্যবসায়ী

২৫ বছরের অপেক্ষা শেষে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়

বগুড়ায় শ্যালিকাকে ধর্ষণের মামলায় দুলাভাইয়ের যাবজ্জীবন

গাবতলীতে ‘খাদিজা ফিলিং স্টেশন’ ও ‘নিউ মডেল দই ঘর’কে জরিমানা

গাবতলীর স্বর্ণা বেকারী’তে মিলল পোড়া তেল ও ক্ষতিকর লবণ

বগুড়া কারাগারে অসুস্থ হয়ে সাবেক যুবলীগ নেতার মৃত্যু

বগুড়ার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে: আতিকুর রহমান রুমন

বগুড়ায় অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে তিনজন গ্রেপ্তার

