ঐতিহ্যের জৌলুস হারাচ্ছে শেরপুরের দই

ঘড়ির কাঁটায় যখন ঠিক দুপুর ১২টা, বগুড়ার শেরপুর পৌর শিশু পার্ক এলাকা মুহূর্তেই রূপ নেয় এক ব্যস্ততম জনপদে। চারপাশ থেকে বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান ও অটোরিকশায় সারি সারি প্লাস্টিকের সাদা-নীল ড্রাম, বালতি ও অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান নিয়ে হাজির হন শত শত দুগ্ধ খামারি। ঠিক দুপুর ১টা বাজতেই আবার সব ফাঁকা।
মাত্র ৬০ মিনিটের এই অস্থায়ী হাটে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার লিটার দুধ কেনাবেচা হয়। মানভেদে প্রতি লিটার দুধ বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়। প্রতিদিন প্রায় ২১ লাখ টাকার দুধের এই লেনদেনের ওপর ভিত্তি করেই টিকে আছে উত্তরের বিখ্যাত শেরপুরের দই শিল্প।

তবে দইয়ের জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতির এই গৌরবোজ্জ্বল সময়ে সরার আকার ছোট হওয়া, ওজনে কম দেওয়া ও দামের কারসাজি নিয়ে ক্রেতাদের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।


বগুড়ার দই বিখ্যাত হলেও এর আদি উৎস মূলত শেরপুর। বগুড়া শহরে দই জনপ্রিয় হওয়ার অন্তত ৫০ বছর আগে থেকেই শেরপুরের কারিগররা এ শিল্পে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন। প্রায় আড়াইশ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে ঘেটু ঘোষের হাত ধরে টক দইয়ের মাধ্যমে এই গৌরবের সূচনা হয়।

প্রায় ১৫০ বছর আগে নীলকণ্ঠ ঘোষ প্রবর্তন করেন বিশ্বখ্যাত ‘সরার দই’ এবং ১৯৪৭ সালে গৌর গোপাল ঘোষ একে বাণিজ্যিক ও রাজকীয় খ্যাতি এনে দেন। ঐতিহ্যগতভাবে এটি হিন্দু ঘোষ সম্প্রদায়ের পেশা হলেও বর্তমানে মুসলিম উদ্যোক্তারাই এই শিল্পে সংখ্যাগুরু।”
শেরপুরের দইয়ের ঐতিহ্য নিয়ে চতুর্থ প্রজন্মের কারিগর কাজল ঘোষ (৩৭) বলেন, “বগুড়া শহর দই চেনার অনেক আগে থেকেই আমার পূর্বপুরষরা মহিষের খাঁটি দুধ দিয়ে হাঁড়িতে দই পাততেন। দাদুর বাবার হাত ধরে এই ব্যবসার সূচনা। শুরুতে হাঁড়িতে দই পাতা হলেও পরবর্তীতে সরার ব্যবহার একে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়।”
তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “বর্তমানে সাভার, দিনাজপুর ও রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে শেরপুরের সরা ও কারিগর নিয়ে গিয়ে নিম্নমানের দই তৈরি করে ‘বগুড়ার দই’ নামে বিক্রি করা হচ্ছে, যা এই আদি শিল্পের দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম নষ্ট করছে। ১০ বছর আগের সেই জৌলুস এখন নকল ও ভেজালের ভিড়ে ম্লান হতে বসেছে।”
শেরপুর দুধ বাজারের ইজারাদার মো: হাফিজ জানান, “এই বাজারটি মূলত অত্র অঞ্চলের দুধ কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন এখান থেকেই শম্পা, বৈকালী, জলযোগ, সাউদিয়া ও রিংকীসহ স্থানীয় ছোট-বড় সকল কারখানা দুধ সংগ্রহ করে। আশপাশের কোনো উপজেলায় এমন বড় বাজার না থাকায় এখান থেকেই যেমন বিভিন্ন এলাকায় দুধ সরবরাহ করা হয়, তেমনি প্রান্তিক বিক্রেতারাও এখানে দুধ নিয়ে আসেন।” তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে আগামীতে দুধের দাম আরও বৃদ্ধির আভাস দেন তিনি।
শেরপুরের দইয়ের স্বাদ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হলেও বর্তমানে এর পরিমাণ ও দাম নিয়ে ক্রেতাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, দিন দিন সরার তলদেশ অস্বাভাবিক মোটা করে দইয়ের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল দই কিনে বাড়ি ফেরার পথে চাকরিজীবী জাহাঙ্গীর জানান, তিনি শহরের ধুনটমোড় থেকে ১৫০ টাকায় দই কিনেছেন, কিন্তু সরার গায়ে নিট ওজনের কোনো উল্লেখ নেই।
নিয়মিত ক্রেতা ও শিক্ষক মোজাফ্ফর আলী বলেন, “ভোক্তারা এখন দ্বিমুখী লোকসান গুনছেন। একদিকে দাম বাড়ছে, অন্যদিকে সরার আয়তন সংকুচিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে দুধের দাম কমলে তার সুবিধা ভোক্তারা পান না।”
উৎপাদন ও বিপণন প্রসঙ্গে শম্পা দধি ভান্ডারের তপন ঘোষ বলেন, “আমরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ মণ দুধ কিনি। বিএসটিআই থেকে প্রতি সরায় ৫০০ গ্রাম দই দেওয়ার নিয়ম আছে এবং আমরা সেই সঠিক ওজন বজায় রাখছি। মান ঠিক রাখতেই আমরা প্রতি সরা ২২০ টাকা দামে বিক্রি করছি।”
বৈকালী দই ঘরের পার্থ সাহা জানান, তারা প্রতিদিন গড়ে ১৭ মণ দুধ কেনেন এবং ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, আগে ৭৫০ গ্রাম দই থাকলেও বর্তমানে পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
শাম্পা দধি এন্ড সুইটস্ এর রকিবুল হাসান জানান, আমাদের বি এস টি আই থেকে প্রতি সরায় ৬০০ গ্রামের অনুমোদন নেওয়া আছে এবং ২২০ টাকায় স্পেশাল দই বিক্রি করছেন।

শেরপুরের দইয়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে মাটির ‘সরা’ তৈরির কারিগরদের ভূমিকা অপরিসীম। মূলত শেরপুরের কল্যাণী, কাশিয়াবালা ও শিমলাসহ আশপাশের গ্রামের কারিগররাই দইয়ের এই সরাগুলো তৈরি ও সরবরাহ করে থাকেন। একসময় এই পেশা কেবল হিন্দু পাল সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে অনেক মুসলিম কারিগরও এই শিল্পে যুক্ত হয়ে মৃৎশিল্পকে সমৃদ্ধ করছেন। কল্যাণী পালপাড়া এলাকায় প্রায় ৩৫ বছর যাবৎ এই পেশায় নিয়োজিত আছেন মো. মতি (৬০)। তিনি বলেন, “আমরা দই ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী ৫০০ গ্রাম, ৬৫০ গ্রাম বা ১ কেজি ধারণক্ষমতার বিভিন্ন মাপের সরা তৈরি করে দিই। বর্তমানে প্রতিটি সরা ১২ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে।”
বগুড়ার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, “দই তৈরিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি কারখানার পরিবেশ উন্নয়ন, জীবাণুমুক্ত সরা ব্যবহার এবং বাজারজাত করার আগে সরার গায়ে বিএসটিআই সনদসহ ওজন ও মেয়াদের তারিখ লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও জরিমানা অব্যাহত রয়েছে।”
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বগুড়ার সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন, “দইয়ের ওজনে কারচুপি ও লেবেলিংয়ে অনিয়ম রোধে শেরপুরে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি সরার গায়ে নিট ওজন ও মেয়াদের তারিখ থাকা বাধ্যতামূলক। আসন্ন ঈদে ওজনে জালিয়াতি রুখতে কারখানা ও শোরুম গুলোতে বিশেষ অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।”
শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নিয়ায কাযমীর রহমান বলেন, “শেরপুরে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি দই তৈরির কারখানা রয়েছে। দুধের গুণগত মান ঠিক রাখতে আমরা স্থানীয় খামারিদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।”
বগুড়া বিএসটিআই আঞ্চলিক অফিসের সহকারী পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “দই বাজারজাত করার ক্ষেত্রে সরার গায়ে ওজন এবং মেয়াদের স্পষ্ট উল্লেখ থাকা বাধ্যতামূলক। আমরা সকল প্রতিষ্ঠানকে ওজনের একটি নির্দিষ্ট মানদন্ডে নিয়ে আসতে কাজ করছি, যাতে ক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে সঠিক পরিমাণ পণ্য পান।”
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, “শেরপুরের দই আমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড এবং এই অঞ্চলের গৌরবের প্রতীক। এই শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষের জীবিকা রক্ষা ও ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা নিয়মিত বাজার তদারকি করছি। দইয়ের ওজনে কারচুপি বা অন্য কোনো অনিয়ম করে যারা এই প্রাচীন শিল্পের সুনাম নষ্ট করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

বগুড়ায় ডিবি হেফাজতে হত্যা মামলার আসামির মৃত্যু

ধুনটে যুবদল নেতার ওপর ককটেল হামলা, যুবলীগ নেতা গ্রেপ্তার

বগুড়ায় দুর্বৃত্তের গুলিতে যুবক আহত

বগুড়ায় ভুয়া ডাক্তারকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা

ধুনটে যমুনা নদীতে ভাসমান নারীর মরদেহ, পরিচয় মেলেনি

বগুড়ার ধুনটে তদন্তে গিয়ে প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ, এসআই প্রত্যাহার

বগুড়ায় বিদ্যালয়ের সামনে যুবককে কুপিয়ে হত্যা

বগুড়ায় হাতুড়ির আঘাতে মিল মালিক দিয়ে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তার ২

বগুড়ার শিবগঞ্জে মিলল কষ্টিপাথরের বিষ্ণু মূর্তি


