বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও সুফি ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে শেরপুরে শুরু হলো ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলা

উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের কেল্লাপোশী মেলা একটি অনন্য নাম। প্রতি বছরের মতো জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রবিবার বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। এটি কেবল একটি গ্রামীণ বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; বরং এটি বাংলার বহুস্তরীয় ইতিহাস, সুফি সংস্কৃতি, ধর্মীয় সমন্বয়বাদ, লোকবিশ্বাস এবং পারিবারিক সামাজিকতার এক জীবন্ত দলিল। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘জামাইবরণ মেলা’, ‘মাদারের মেলা’ কিংবা ‘কেল্লাপোশীর মেলা’, যে নামেই পরিচিত হোক না কেন, এর সাংস্কৃতিক অভিঘাত বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই মেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ হলো ‘মাদার খেলা’ বা ‘মাদারের লাঠিখেলা’। মেলা শুরু হওয়ার অন্তত পাঁচ দিন আগে থেকেই শেরপুর ও আশপাশের গ্রামীণ জনপদে ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা আর লাঠিসোঁটার আওয়াজে শুরু হয় এই লোকজ আচার। মাদাদেরর দল গ্রাম ঘুরে খেলা দেখিয়ে আমন্ত্রণ জানায় কেল্লা পোশী মেলার।
লোককথা ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, কেল্লাপোশী মেলার সূচনা হয়েছিল ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। সেই হিসেবে ২০২৬ সালে মেলাটি ৪৭০ বছরে পদার্পণ করেছে। মেলার উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা লোকসাহিত্যের বিখ্যাত গাজী-কালু-চম্পাবতীর কাহিনি।

কিংবদন্তি অনুসারে, বৈরাটনগরের দরবেশ শাহ সেকেন্দারের রূপবান পুত্র গাজী মিয়া এবং তাঁর পালিত ভাই কালু মিয়া রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে ধর্মপ্রচারে বের হন। এক পর্যায়ে তাঁরা বর্তমান বগুড়া অঞ্চলের ব্রাহ্মণনগরে এসে পৌঁছান। সেখানে ব্রাহ্মণ রাজা মুকুট রায়ের একমাত্র কন্যা চম্পাবতী গাজী মিয়ার প্রেমে পড়েন। গাজী মিয়ার পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কালু মিয়া রাজদরবারে গেলে রাজা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে বন্দি করেন। ভাইকে উদ্ধারের জন্য গাজী মিয়া শেরপুরের কুসুম্বী এলাকায় একটি সামরিক দুর্গ নির্মাণ করেন।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সেই ‘কেল্লা’ বা দুর্গ থেকেই পরবর্তীকালে এলাকার নাম হয় ‘কেল্লাপোশী’। গাজী মিয়া ও রাজা মুকুট রায়ের বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত গাজী মিয়া বিজয়ী হন। কালু মিয়াকে উদ্ধার করার পাশাপাশি তিনি চম্পাবতীকে বিয়ে করেন। এই বিজয় ও বিবাহ উৎসবকে কেন্দ্র করেই কেল্লাপোশীতে শুরু হয় আনন্দোৎসব, যা ধীরে ধীরে বার্ষিক লোকমেলায় রূপ নেয়।
কেল্লাপোশী মেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সুফি ঐতিহ্য। মেলার আগে অনুষ্ঠিত মাদার খেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামের মারেফতি ধারার বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত সৈয়দ বদিউদ্দীন জিন্দা শাহ মাদার (রহ.)-এর অনুসারী ‘মাদারিয়া’ তরিকার প্রভাব। মাদার খেলায় ব্যবহৃত প্রতীকী বাঁশটিকে স্থানীয় মানুষ ‘মাদার পীরের দণ্ড’ বলে মনে করেন।
খেলার শুরুতে ওস্তাদ বা প্রধান বয়াতি একটি নির্দিষ্ট বাঁশঝাড় থেকে এক কোপে সোজা বাঁশ কাটেন। পরে সেটিকে নদীতে স্নান করিয়ে লাল কাপড়ে মুড়িয়ে বিভিন্ন স্থানে মানুষের চুল বা চামর দিয়ে সাজানো হয়। এই সাজানো বাঁশ নিয়ে ১৫ থেকে ২০ জনের দল ঢাক-ঢোল বাজিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে লাঠিখেলা প্রদর্শন করে। দলটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গায়, মাদার পীরের বন্দনা করে এবং মানুষের কাছ থেকে মানত ও দান সংগ্রহ করে।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই খেলায় অংশগ্রহণ বা মানত করলে রোগব্যাধি, পারিবারিক অশান্তি কিংবা অমঙ্গল দূর হয়। ফলে এটি নিছক বিনোদন নয়; বরং গ্রামীণ মানুষের আধ্যাত্মিক নিরাপত্তাবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
আমইন গ্রামের বজলু শেখ মাদারের লাঠি খেলেন। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি মাদারের বাঁশ খুবই পবিত্র। পৃথিবীর সৃষ্টির সময় দম বন্ধ করা পরিবেশ ছিল। আসমান থেকে মাদারের বাঁশ জমিনে আসলে সবকিছু শান্ত হয়ে যায়।”
গবেষকদের মতে, মাদার খেলার লাঠিচালনা ও শারীরিক কসরতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনেরও সম্পর্ক রয়েছে। অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সংগঠিত ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেতা মজনু শাহ ছিলেন মাদারিয়া তরিকার অনুসারী।
ধারণা করা হয়, মাদার খেলায় ব্যবহৃত লাঠিচালনা একসময় আত্মরক্ষামূলক ও সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ ছিল। সময়ের পরিবর্তনে তা লোকজ খেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। কেল্লাপোশী মেলা বাংলার ধর্মীয় সমন্বয়বাদেরও একটি অনন্য উদাহরণ। এখানে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও সমান উৎসাহে অংশ নেন। গাজী মিয়া, মাদার পীর, চম্পাবতী কিংবা কালু মিয়া—সব চরিত্রই স্থানীয় লোকবিশ্বাসে ধর্মীয় বিভাজন ছাড়িয়ে এক ধরনের সামষ্টিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। এ কারণেই মেলায় এসে মানুষ ধর্মের চেয়ে উৎসবকেই বড় করে দেখে।
স্থানীয়ভাবে একটি জনপ্রিয় ছড়া এখনও প্রচলিত আছে, “কেল্লাপোশী মেলার রাজা মাদার পীরের চামর পূজা, মেলা নয়তো ঠেলার বাজার, লোক জমে যায় হাজার হাজার।” এই মেলার সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যময় দিক হলো এর ‘জামাইবরণ’ সংস্কৃতি। জ্যৈষ্ঠ মাসের এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামের বিবাহিতা মেয়েদের বাপের বাড়িতে আসার রেওয়াজ রয়েছে।
জামাইদের বিশেষভাবে নিমন্ত্রণ করা হয়। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে জামাইদের ‘সেলামি’ দেওয়া হয়, যাতে তারা মেলা ঘুরতে পারে। জামাইরা মেলা থেকে বড় বড় মাছ, খাসি, মাটির পাতিলে ভরা মিষ্টি কিংবা অন্যান্য উপহার কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসেন।
গ্রামীণ সমাজে এই প্রথার নৃতাত্ত্বিক গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। এটি মূলত পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্নবীকরণের একটি সামাজিক আচার। বিবাহের পর মেয়েরা শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ার ফলে দুই পরিবারের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, এই মেলা সেটিকে কমিয়ে আনে। শ্যালক-শ্যালিকা, আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের নিয়ে জামাইদের মেলায় ঘোরাঘুরি এক ধরনের সামাজিক পুনর্মিলনের পরিবেশ সৃষ্টি করে। কেল্লাপোশী মেলা উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি বড় কেন্দ্র।
এখানে স্থানীয় কুটিরশিল্প, দারুশিল্প এবং কৃষিনির্ভর পণ্যের বিশাল বাজার গড়ে ওঠে। মেলায় উন্নতমানের কাঠের খাট, আলমারি, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র বিক্রি হয়। স্থানীয় কারিগররা সারা বছরের প্রস্তুতি নিয়ে এই মেলায় পণ্য নিয়ে আসেন।
এছাড়া মেলায় বিশাল আকারের মাছ এবং বড় বড় মিষ্টির সমাহার বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে। যমুনা নদী ও চলনবিল অঞ্চল থেকে আনা ১০ থেকে ২০ কেজি ওজনের মাছ এবং ৫ থেকে ১০ কেজির মিষ্টি মেলার আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। অনেকে এটিকে উত্তরবঙ্গের লোক-অর্থনীতির এক মৌসুমি বাণিজ্যিক কেন্দ্রও বলে থাকেন।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থেকে এসেছেন আলতাব হোসেন। তিনি মেলায় বসেছেন খেলনার দোকান। আলতাফ হোসেন বলেন, আমি প্রতিবছর এই মেলায় আসি। খেলনা বিক্রি করে আমার সংসার চলে। তবে এই মেলায় দোকান বসাতে প্রতি হাত জায়গার জন্য ১০০০ টাকা করে দিতে হয়। এবারে হাত হাত জায়গার জন্য ৭০০০ টাকা দিতে হবে। সাথে ১০০০ টাকা খাজনা দিতে হবে। কালু গাজীর আস্তানাকে ঘিরে মেলার আয়োজন হলেও বঞ্চিত সেখানকার ভক্তরা।
এমনই একজন ভক্ত শহিদুল ইসলাম দিপু বলেন, “মেলাতে কেন্দ্র করে প্রতিবছর একটা করে কমিটি হয়। সে কমিটি লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় করলেও আমরা কোন সুবিধা পাই না। আস্তানারও কোন উন্নতি হয় না।” মেলাকে ঘিরে জুয়া ও অশ্লীল নৃত্যের অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
আমন গ্রামের ফজলুর রহমান বলেন, “আগে মেলায় সার্কাস, যাত্রাপালা হত। আমরা সবাই মিলে উপভোগ করতাম। কিন্তু এখন যাত্রাপালা নেই। বিচিত্রা অনুষ্ঠানের নামে অশ্লীল নৃত্য চলে। প্রকাশ্যে বসে জুয়ার আসর। এসব কারণে স্থানীয় যুবকেরা অধঃপতিতা হচ্ছে। এলাকাবাসী মনে করেন, প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে চার শতকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই মেলা আবারো তার আদি রূপ ফিরে পাবে।
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, এবারের মেলায় কোন ধরনের অশ্লীলতা ও জুয়া চলতে দেওয়া হবে না। আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পাঠক মন্তব্য (০টি মন্তব্য)
প্রথম পাঠক হিসেবে মতামত দিন
সর্বশেষ সংবাদের আপডেট পান
ইমেইল নিউজলেটার ফিচারটি শীঘ্রই চালু হবে।
শীঘ্রই আসছে
পঠিতব্য আরও খবর (আপনাদের জন্য প্রস্তাবিত)

শেরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে হট্টগোলে নিবন্ধন বন্ধ

শেরপুরে ১৫শ' পিস ট্যাপেন্টাডলসহ গ্রেপ্তার ১

শেরপুরে জরিমানার জেরে দুই মাংস বিক্রেতার দ্বন্দ্বে থানায় অভিযোগ

শেরপুরে বাল্যবিবাহ ও মাদক প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত

শেরপুরে পূজা উদযাপন পরিষদের বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ উদ্বোধন

শেরপুরে উল্টো পথের ট্রাকের ধাক্কায় নিহত ১, আহত ৩

শেরপুরে মজুমদার ফুডসের দূষণের প্রতিবাদে গ্রামবাসীর মানববন্ধন

বগুড়া জেলা আদিবাসী যুব পরিষদের কমিটি গঠন, ডলি সভাপতি, লক্ষ্মী সম্পাদক

১৬ দিনেও নিখোঁজ আরডিএ স্কুলছাত্রী রাফার সন্ধান মেলেনি


